চট্টগ্রামের এক নারীর উন্নত জীবনের স্বপ্ন বিদেশে গিয়ে ভয়াবহ মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত মাতৃত্বের করুণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে কাজের আশায় যাওয়া এই নারী দেশে ফিরে আসেন চরম শারীরিক দুর্বলতা, অপুষ্টি এবং গর্ভাবস্থার অবস্থায়, যা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনি দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট এবং একাকীত্ব থেকে মুক্তির আশায় বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়েন। তার ধারণা ছিল, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তিনি নিজের ও সন্তানের জীবন উন্নত করতে পারবেন। কিন্তু দালালের প্রতারণায় সেই স্বপ্ন দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তিনি প্রত্যাশিত কাজের পরিবর্তে এক ধরনের বন্দিদশার মুখোমুখি হন। তাকে জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নিপীড়নের শিকার হতে হয় বলে জানা যায়। তার চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করে দেওয়া হয় এবং তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে অবশেষে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দেশে ফেরার পর চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে জানা যায়, তিনি গর্ভবতী ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৪ মে তিনি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে সন্তানসহ তিনি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। সংশ্লিষ্ট সহায়তা সংস্থার তত্ত্বাবধানে তিনি কিছু সময় চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সহায়তা পান, পরে নিজ গ্রামে ফিরে যান।
তার জীবনের পটভূমিও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই নারী শৈশবে বাবাকে হারান। এরপর নানা-নানির কাছে বড় হন। মায়ের পুনর্বিবাহের পর পারিবারিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তিনি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন এবং এক সময় একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন। পরে একজন নারী তাকে ঢাকায় নিয়ে যান।
কৈশোরে তার বিয়ে হয়, তবে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আবারও একা হয়ে পড়েন। এক সন্তান নিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে আরেক সন্তানকে অন্য পরিবারের কাছে দিতে বাধ্য হন। জীবিকার তাগিদে তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন। সেই সময়ই দালালের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে বিদেশে কাজের প্রলোভনে পড়েন এবং ভিসা, মেডিকেল ও প্রক্রিয়াকরণ খরচ বাবদ প্রায় দশ হাজার টাকা প্রদান করেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সময়রেখা নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| সময়কাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৯৭ | চট্টগ্রামে জন্ম |
| শৈশব | পিতৃবিয়োগ, নানা-নানির কাছে লালন-পালন |
| কৈশোর | বিয়ে এবং পরবর্তী বিধবাত্ব |
| ২০২৪ সালের ডিসেম্বর | দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যাত্রা |
| ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি | শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় দেশে প্রত্যাবর্তন |
| ২০২৫ সালের ২৪ মে | কন্যা সন্তানের জন্ম |
| পরবর্তী তিন মাস | চিকিৎসা ও সহায়তা প্রক্রিয়া |
| সাম্প্রতিক সময় | সন্তানসহ নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তন |
এই ঘটনা প্রবাসে কর্মসংস্থানের নামে সংঘটিত মানবপাচার ও প্রতারণার ভয়াবহ বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও অসহায় নারীরা কীভাবে দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন, এই ঘটনা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এতে করে নিরাপদ অভিবাসন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে।
