বিশ্বজুড়ে সাইবার বীমা ও পুনর্বীমা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, একই সঙ্গে এই ঝুঁকির প্রকৃতিও আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাইবার বীমার মোট গ্রস রিটেন প্রিমিয়াম (GWP) ২০২০ সালের প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২০২৬ সালে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পুনর্বীমা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান গ্যালাঘার রি-এর পূর্বাভাস বলছে, এই বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে।
এই দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বীমা ও পুনর্বীমা শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—ঝুঁকি ধরে রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং কোটা-শেয়ার সিডিং কমে যাওয়া। এর ফলে অতিরিক্ত ক্ষতি বা এক্সেস অব লস (Excess of Loss) পুনর্বীমার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনুমান করা হচ্ছে, দশকের শেষ নাগাদ এই চাহিদা বছরে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
গ্যালাঘার রি তাদের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন “Cyber and Property Combined Covers: Buying the Tail More Efficiently”-এ উল্লেখ করেছে, সাইবার ঝুঁকি এখন আর শুধুমাত্র প্রযুক্তিনির্ভর পৃথক ঝুঁকি নয়; এটি বৈশ্বিক বীমা খাতের জন্য একটি বড় অস্থিরতার উৎসে পরিণত হয়েছে। এমনকি এটি বর্তমানে প্রচলিত প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত প্রপার্টি ক্যাটাস্ট্রফি ঝুঁকির সমপর্যায়ের গুরুত্ব বহন করছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সাইবার ঝুঁকির অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য সিস্টেমিক ক্ষতির কারণে পুনর্বীমাকারীরা এখনো পৃথক সাইবার কভারেজে তুলনামূলকভাবে উচ্চ প্রিমিয়াম নির্ধারণ করছে। তবে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে সাইবার ও প্রপার্টি ক্যাটাস্ট্রফি ঝুঁকিকে একত্র করে “শেয়ার্ড লিমিট স্ট্রাকচার” তৈরি করা। এই কাঠামোতে একই পলিসির অধীনে দুই ধরনের ঝুঁকি কাভার করা সম্ভব হয়, ফলে মোট মূলধন ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
গ্যালাঘার রি-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সমন্বিত কাঠামো প্রয়োগ করলে বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এর মূল কারণ হলো সাইবার ও প্রপার্টি ঝুঁকির মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম সম্পর্ক (low correlation), ফলে একই মূলধন দিয়ে অধিক কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়।
নিচে সাইবার পুনর্বীমা বাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিত্র তুলে ধরা হলো—
| সূচক | ২০২০ | ২০২৬ | ২০৩০ (প্রক্ষেপণ) |
|---|---|---|---|
| সাইবার GWP বাজার | ৮ বিলিয়ন ডলার | ১৬ বিলিয়ন ডলার | ২৬ বিলিয়ন ডলার |
| Excess of Loss চাহিদা | — | বৃদ্ধি পাচ্ছে | ~৯ বিলিয়ন ডলার/বছর |
| ILS বাজারের আকার | — | ১২৮ বিলিয়ন ডলার (২০২৫) | সম্প্রসারণ অব্যাহত |
| সম্ভাব্য ব্যয় সাশ্রয় | — | ২৫% (কম্বাইন্ড কভার) | ~২০% (ILS কাঠামো) |
গ্যালাঘার রি আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই খাতে সবচেয়ে বড় দক্ষতা বৃদ্ধি আসবে ইন্স্যুরেন্স-লিংকড সিকিউরিটিজ (ILS) বাজার থেকে। এই বাজারে সাইবার ক্যাটাস্ট্রফি বন্ড ইতোমধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ILS বাজারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৮ বিলিয়ন ডলারে, যা এই খাতের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।
২০২৬ সালে বীমা প্রতিষ্ঠান Beazley কর্তৃক ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সাইবার ক্যাটাস্ট্রফি বন্ড ইস্যু এখন পর্যন্ত এই ধরনের সবচেয়ে বড় লেনদেন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করছে যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে সাইবার ঝুঁকিকে একটি স্বতন্ত্র বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ শ্রেণি হিসেবে গ্রহণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার ও প্রপার্টি ঝুঁকি একত্র করে ILS বাজারে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অতিরিক্ত প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এটি পুনর্বীমা শিল্পের ওপর মূলধন চাপ কমাবে এবং ঝুঁকির বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে গ্যালাঘার রি মনে করে, সাইবার ঝুঁকির দ্রুত সম্প্রসারণ আগামী দিনে বৈশ্বিক বীমা খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রচলিত পুনর্বীমা কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন সমন্বিত ও উদ্ভাবনী মডেল গ্রহণই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
