রোমেনা আফাজ: বনহুরের স্রষ্টার অমলিন উত্তরাধিকার

রোমেনা আফাজ বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর সাহিত্যকর্ম কয়েক প্রজন্মের পাঠককে মুগ্ধ করেছে। রহস্য, রোমাঞ্চ, সামাজিক জীবন, ইতিহাস, প্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধ—সবকিছুকে তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল লেখনীর মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে তাঁর সৃষ্ট কিংবদন্তিতুল্য চরিত্র ‘দস্যু বনহুর’ বাংলা কিশোর ও জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন।

১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন রোমেনা আফাজ। তাঁর পিতা কাজেম উদ্দীন আহমদ এবং মাতা বেগম আছিয়া খাতুন। অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা ছিল ‘বাংলার চাষী’ শীর্ষক একটি ছড়া, যা সে সময়ের খ্যাতিমান সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই সূচনাই পরবর্তীকালে তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক শক্তিশালী কণ্ঠে পরিণত করে।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার ফুলকোট গ্রামের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আফাজ উল্লাহ সরকারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীর পদবি গ্রহণ করে তিনি সাহিত্যজগতে ‘রোমেনা আফাজ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই নামই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’ প্রকাশের পর সাহিত্যাঙ্গনে তিনি দ্রুত পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে তিনি সামাজিক, ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, রহস্য, গোয়েন্দা এবং কিশোর সাহিত্যসহ নানা ধারায় বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেন। জীবদ্দশায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫০টিরও বেশি, যা বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

রোমেনা আফাজের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে আলোচিত সৃষ্টি নিঃসন্দেহে ‘দস্যু বনহুর’। এই চরিত্রটি ছিল অন্যায়, অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক রহস্যময় নায়ক, যে নিজের স্বতন্ত্র কৌশলে অপরাধের মোকাবিলা করত। বনহুরের সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা, মানবিকতা এবং রোমাঞ্চকর অভিযান পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ফলে চরিত্রটি শুধু একটি সাহিত্যিক সৃষ্টিই নয়, বরং বাংলা জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়।

নিচের সারণিতে রোমেনা আফাজের জীবন ও কর্মের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
জন্ম২৭ ডিসেম্বর ১৯২৬
জন্মস্থানশেরপুর, বগুড়া
প্রথম প্রকাশিত রচনা‘বাংলার চাষী’
প্রথম উপন্যাস‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’
প্রকাশিত গ্রন্থ২৫০টিরও বেশি
সর্বাধিক জনপ্রিয় চরিত্রদস্যু বনহুর
মৃত্যু১২ জুন ২০০৩
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর, ২০১০)

তাঁর সাহিত্যকর্মের জনপ্রিয়তা বইয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে চলচ্চিত্র জগতেও প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় জনপ্রিয় চলচ্চিত্র, যার মধ্যে ‘কাগজের নৌকা’, ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘মধুমিতা’, ‘মাটির মানুষ’ এবং ‘দস্যু বনহুর’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব চলচ্চিত্র তাঁর সাহিত্যকে বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন। নারীশিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়। মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও আশা-আকাঙ্ক্ষা তাঁর লেখার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল।

বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ২০১০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর তিনি বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বহু সম্মাননা লাভ করেন।

তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতি পরিষদ’। বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় অবস্থিত তাঁর বাসভবনও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব উদ্যোগ তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

২০০৩ সালের ১২ জুন তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে তাঁর প্রস্থান বাংলা সাহিত্যে সৃষ্ট শূন্যতাকে আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর রচিত চরিত্র, গল্প ও উপন্যাস এখনো পাঠকের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। বিশেষ করে ‘দস্যু বনহুর’ বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এই প্রবাদপ্রতিম কথাশিল্পীকে। তিনি শুধু একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের এক যুগস্রষ্টা, যাঁর সৃষ্ট জগৎ আজও পাঠকের হৃদয়ে সমানভাবে জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক।