বৈশ্বিক নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা পুনর্বীমা (রিইনশিওরেন্স) খাতে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এএম বেস্ট তাদের দৃষ্টিভঙ্গি “পজিটিভ” থেকে পরিবর্তন করে “স্টেবল” বা স্থিতিশীল পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। সংস্থাটির মতে, বিশেষ করে সম্পত্তি (প্রপার্টি) রিইনশিওরেন্স খাতে প্রিমিয়াম বা হার কমে যাওয়া এবং বাজার ধীরে ধীরে পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরে আসা এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি (RIMS) আয়োজিত RISKWORLD সম্মেলনে এএম বেস্টের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ড্যান হফমিস্টার এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রপার্টি রিইনশিওরেন্স সেগমেন্টে মূল্য নির্ধারণ বা রেট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং তা এখন ২০২৩ সালের আগের স্বাভাবিক বাজার পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ২০২৩ সালের পর যে কঠোর মূল্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে।
তবে প্রিমিয়াম কমলেও রিইনশিওরাররা তাদের চুক্তিগত শর্তে কঠোরতা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে উচ্চতর অ্যাটাচমেন্ট পয়েন্ট অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অ্যাটাচমেন্ট পয়েন্ট বলতে বোঝানো হয়, ক্ষতির এমন একটি নির্দিষ্ট সীমা যেখানে পৌঁছানোর পর রিইনশিওরার ক্ষতিপূরণ দিতে শুরু করে। এই সীমা যত বেশি হয়, তত বেশি ক্ষতির দায় মূল বীমা কোম্পানির ওপর থাকে।
হফমিস্টারের ব্যাখ্যায়, প্রিমিয়াম হ্রাসের অন্যতম বড় কারণ হলো মূল বীমা কোম্পানিগুলোর উন্নত আন্ডাররাইটিং বা ঝুঁকি মূল্যায়ন সক্ষমতা। আন্ডাররাইটিং উন্নত হওয়ায় বীমা কোম্পানিগুলো তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পলিসি আরও দক্ষভাবে বাছাই করতে পারছে, ফলে তাদের সামগ্রিক পোর্টফোলিও শক্তিশালী হয়েছে এবং পুনর্বীমার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।
এছাড়া বাজারে উচ্চ ডিডাকটিবল বা প্রাথমিক ক্ষতির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিডাকটিবল হলো এমন একটি নির্দিষ্ট ক্ষতির পরিমাণ যা প্রথমে বীমা গ্রাহক বা প্রাইমারি ইনসুরার নিজে বহন করে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি আকারের দুর্যোগ বা ক্ষতির ক্ষেত্রে ঝুঁকির একটি বড় অংশ এখন মূল বীমা কোম্পানির দিকে ফিরে গেছে। এতে রিইনশিওরারদের ওপর চাপ কমেছে এবং তারা মূলত বড় ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পুঁজি সুরক্ষার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
শিল্প খাতের অনুমান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিইনশিওরারদের বহন করা দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এটি শুধু প্রিমিয়াম পরিবর্তনের ফল নয়, বরং ঝুঁকি বণ্টন কাঠামোর একটি বড় ধরনের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ক্ষতির বড় অংশ এখন প্রাইমারি স্তরেই শোষিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ক্যাজুয়ালটি রিইনশিওরেন্স বা দায়বীমা পুনর্বীমা খাতে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। এখানে “সোশ্যাল ইনফ্লেশন” বা সামাজিক মূল্যস্ফীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করছে। সামাজিক মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণত মামলার ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি, আদালতের রায় আরও বড় অঙ্কের হওয়া এবং আইনি ব্যয় বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়। এর পাশাপাশি দাবি নিষ্পত্তির খরচও ক্রমাগত বাড়ছে।
এই কারণে কিছু রিইনশিওরার আগের বছরের ক্ষতির জন্য অতিরিক্ত রিজার্ভ বা অর্থ সংরক্ষণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যাকে অ্যাডভার্স রিজার্ভ ডেভেলপমেন্ট বলা হয়। অর্থাৎ পূর্বে ধারণ করা ক্ষতির পরিমাণ বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় কম ধরা হয়েছিল, ফলে পরে তা সংশোধন করে বাড়তি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।
হফমিস্টার আরও উল্লেখ করেন যে, বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ রয়েছে—বর্তমান প্রিমিয়াম বৃদ্ধি দাবি বা ক্লেইম খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। কিছু প্রতিষ্ঠান মনে করে বর্তমান মূল্যায়ন যথেষ্ট, আবার অন্যরা মনে করে ঝুঁকি ও দাবির ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় প্রিমিয়াম এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বৈশ্বিক রিইনশিওরেন্স বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো বিকল্প পুঁজির (Alternative Capital) ক্রমবর্ধমান ভূমিকা। এই পুঁজি সাধারণ বীমা কোম্পানির বাইরে থেকে আসে, যেমন ইনস্যুরেন্স-লিঙ্কড সিকিউরিটিজ (ILS)। এই ধরনের আর্থিক উপকরণে বিনিয়োগকারীরা বীমা ঝুঁকি বহন করে এবং বিনিময়ে রিটার্ন পান। এটি বাজারে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করছে এবং প্রচলিত রিইনশিওরারদের সঙ্গে সমান্তরালভাবে কাজ করছে।
হফমিস্টারের মতে, যদিও এই বিকল্প পুঁজির উপস্থিতি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম কমার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, তবুও এটি মূলধারার রিইনশিওরেন্স ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে।
ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে এএম বেস্টের মূল্যায়ন হলো, বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত বা ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া রিইনশিওরেন্স বাজারে উল্লেখযোগ্য কঠোরতা বা নতুন করে প্রিমিয়াম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সংস্থাটি মনে করে, বাজারে আবার উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হতে হলে বীমাকৃত মোট ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার বেশি হতে হবে, তবেই এটি বৈশ্বিক পুঁজি কাঠামোর ওপর পর্যাপ্ত প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক রিইনশিওরেন্স বাজার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে একদিকে প্রিমিয়াম স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসছে, অন্যদিকে ঝুঁকি বণ্টন, চুক্তিগত কাঠামো এবং বিকল্প পুঁজির অংশগ্রহণ বাজারকে নতুন বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
