বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট লেখিকা লিনু হকের জন্মদিন

সাহস, সংগ্রাম, দেশপ্রেম এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুলেখিকা ও সাবেক ছাত্রনেত্রী লিনু হকের জন্মদিন আজ। বাংলালি বা বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে গণমানুষের মুক্তির লড়াই—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন সাহসী ও আপোষহীন নেত্রী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মাত্র দশম শ্রেণির ছাত্রী। কিন্তু বয়সের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে অদম্য সাহসিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

১৯৫৫ সালের ১৫ জুন রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনিতে লিনু হক জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী ইউসুফ আলী এবং মাতা জোহরা বেগম। তাঁদের আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নয়নপুর এলাকায়। তাঁর পিতা একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি সংস্থাপন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। আজিমপুর স্কুলেই লিনু হকের শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটেছিল।

ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রয়াত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডাক্তার আব্দুল হামিদের সহধর্মিণী। লিনু হকের দুই সন্তান নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর পুত্র ইরেশ হক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের আরলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তায় পিএইচডি বা ডক্টর অব ফিলোসফি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ এক দশক মিজৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। লিনু হকের কন্যা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের সাউথহ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে স্নায়ুরোগ বিভাগের কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী চিকিৎসকদের অন্যতম।

আদর্শ ও লেখনী: লিনু হক যা বিশ্বাস করেন, তা-ই অনুশীলন করেন। নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে তিনি নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে চলেছেন। তাঁর আদর্শ, নীতি, সাহস এবং স্পষ্টবাদিতা ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বেদনা, গৌরব ও নারীর অবদানের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে লিনু হক নিরলসভাবে কাজ করছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘মেয়ে বিচ্ছু’ এবং ‘গার্লস অব গ্যালান্ট্রি: আজিমপুর ১৯৭১’ পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। আজিমপুরের মুক্তিযোদ্ধা নারীদের সাহসিকতার কাহিনি নিয়ে রচিত এই গ্রন্থগুলো ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে নতুন করে তুলে ধরেছে। পাঠকের ব্যাপক আগ্রহের কারণে তাঁর পুত্র ইরেশ হক পরবর্তীতে ‘মেয়ে বিচ্ছু’ গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ সম্পন্ন করেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এই ইতিহাসকে পরিচিত করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর তথ্যনির্ভর মূল্যবান গ্রন্থ ‘অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ’৭১’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী’ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ও ইতিহাসচর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

লিনু হকের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত ও প্রকাশিত গ্রন্থাবলি

বিবরণীতথ্য ও বিবরণ
জন্ম তারিখ ও স্থান১৫ জুন, ১৯৫৫ সাল; আজিমপুর সরকারি কলোনি, ঢাকা।
পিতা ও মাতাপিতা: কাজী ইউসুফ আলী, মাতা: জোহরা বেগম।
আদি নিবাসনয়নপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
শিক্ষাজীবনের সূচনাআজিমপুর স্কুল, ঢাকা।
পারিবারিক পরিচয়স্বামী: প্রয়াত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. আব্দুল হামিদ। সন্তান: এক পুত্র ও এক কন্যা।
২০২১ সালের গ্রন্থাবলি‘মেয়ে বিচ্ছু’ এবং ‘গার্লস অব গ্যালান্ট্রি: আজিমপুর ১৯৭১’।
২০২৩ সালের গ্রন্থাবলি‘অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ’৭১’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী’।

লিনু হক কেবল একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা নন, বরং তিনি ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী এবং সংগ্রামের এক উজ্জ্বল প্রতীক। জন্মদিনের এই বিশেষ ক্ষণে বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্পষ্টবাদী ও দৃঢ়চেতা লেখিকা লিনু হকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অফুরন্ত শুভকামনা জ্ঞাপন করা হচ্ছে। তাঁর লেখনী নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস, মানবিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পরিচিত করছে এবং সমৃদ্ধ করছে পাঠকসমাজকে। তিনি সুস্থ ও আলোকিত থেকে দীর্ঘজীবী হোন এবং তাঁর কলমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মানবিকতার বাণী ও সত্যের দীপ্তি আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই কামনা।