বিতর্ক ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আসন্ন পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরোনো অনিয়ম, বিতর্ক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শীর্ষতম ও ধনী ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্ব বদল হলেও একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করার ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্ষদই ব্যর্থ হয়েছে। আগামী ৭ জুনের নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ১৬ মে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে বিগত নির্বাচনগুলোর মতোই এই নির্বাচনের প্রতিটি ধাপেও অস্বচ্ছতা ও একপেশে সিদ্ধান্তের কারণে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের ক্রিকেটকে বিশ্ব দরবারে সমালোচিত করছে।

গত ৭ এপ্রিল জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আহ্বায়ক বা অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল একটি সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে প্রভাবমুক্ত নির্বাচন সম্পন্ন করা। তবে সেই লক্ষ্যটি ভেস্তে গেছে, কারণ আহ্বায়ক কমিটির মোট ১১ জন সদস্যের মধ্যে স্বয়ং সভাপতি তামিম ইকবালসহ ৭ জন সদস্য নিজেই আসন্ন নির্বাচনে পরিচালক পদের জন্য প্রার্থী হয়েছেন। যদিও বোর্ডের বিদ্যমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এতে কোনো আইনি বাধা নেই, তবে নির্বাচন আয়োজনকারীদের নিজেদেরই প্রার্থী হওয়ার এই ঘটনাটি নৈতিকতার দিক থেকে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নির্বাচনী ক্যাটাগরি ও বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র

বিসিবি নির্বাচনের ১৮৪ জন কাউন্সিলরের ভোট প্রদান এবং বিভিন্ন বিভাগ বা ক্যাটাগরির অধীনে বর্তমান প্রার্থীদের বাস্তব অবস্থা নিচে ছকের সাহায্যে তুলে ধরা হলো:

ক্যাটাগরির বিবরণমোট বরাদ্দকৃত পদবর্তমান নির্বাচনী চিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন
ক্যাটাগরি-১ (জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা)১০টি পরিচালক পদ১০টি পদের মধ্যে ৭ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী। অবশিষ্ট ৩টি পদের (খুলনার দুটি ও বরিশালের একটি) জন্য নামমাত্র ভোট হবে।
ক্যাটাগরি-২ (ঢাকার বিভিন্ন প্রথম সারির ক্লাব)১২টি পরিচালক পদ২ জন প্রার্থী তাঁদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করায় প্রার্থীর সংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১৬ জন হয়েছে। এর মধ্যে ৭ থেকে ৮ জন পূর্ব সমঝোতায় সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন।
ক্যাটাগরি-৩ (বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি সংস্থাসমূহ)১টি পরিচালক পদএই বিভাগে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই একমাত্র প্রার্থী বিনা বাধায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন।
সার্বিক ভোটার ও প্রার্থী তালিকা১৮৪ জন ভোটার (২৩টি পদ)মোট প্রার্থী ও ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী অথবা তাঁদের নিকটাত্মীয়।

সংগঠনের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সন্তান ও স্বজনদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করায় জাতীয় সংসদেও এটি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এক সংসদ সদস্য এই অন্তর্বর্তী কমিটিকে ব্যঙ্গ করে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রার্থী তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বড় একটি অংশ কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার ‘দোয়ানির্ভর’। এই রাজনৈতিক মেকানিজমের কারণে ঢাকার ক্লাবভিত্তিক ‘ক্যাটাগরি-২’ এর প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র চাপা ক্ষোভ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে পরিচালক বানানোর জন্য ওপর মহল থেকে ক্লাবগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে সরকারপক্ষের সাথে একাধিক সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কোণঠাসা প্রার্থীরা ভবিষ্যৎ হয়রানির ভয়ে মুখ খুলছেন না।

ইতিপূর্বে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রতিনিধিদের কাছে এই আসন্ন নির্বাচনকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়েছে। অতীতেও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বোর্ডে আসতেন, তবে তাঁদের বড় পরিচয় ছিল ক্রীড়া সংগঠক। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন; অনেক জেলার জেলা প্রশাসক (যারা পদাধিকারবলে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি) স্থানীয় অ্যাডহক কমিটিকে অন্ধকারে রেখে নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যক্তির নাম কাউন্সিলর বা ভোটার তালিকায় পাঠিয়েছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রহস্যময় ‘ই-ভোট’ বা অনলাইনের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া। ফলে, ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার যে দাবি করা হয়েছিল, তা বিসিবির এই একপেশে নির্বাচনের মাধ্যমে অবাস্তব প্রমাণিত হতে চলেছে।