বাবা-মায়ের পাশেই চিরনিদ্রায় তোফায়েল আহমেদ

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা তোফায়েল আহমেদের শেষ ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে ভোলার পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাকে তার বাবা মরহুম আজহার আলী এবং মা ফাতেমা খানমের কবরের পাশেই সমাহিত করা হবে। এ জন্য মঙ্গলবার সকালে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে কবর খননের কাজ শুরু হয়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবদ্দশায় তোফায়েল আহমেদ একাধিকবার নিজের শেষ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাকে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে শায়িত করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের শিকড় ও পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। সেই কারণেই পরিবারের সদস্যরা তার ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বিকেলে নিজ বাড়ির সামনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে স্থানীয় জনগণ, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

কবর খননের দায়িত্ব পালন করছেন ৭০ বছর বয়সী আবু তাহের। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি এলাকায় কবর খননের কাজ করে আসছেন এবং শতাধিক কবর খননের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বিশেষভাবে তোফায়েল আহমেদের পরিবারের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। এর আগে তিনি তোফায়েল আহমেদের বাবা আজহার আলী, মা ফাতেমা খানম, স্ত্রী আনোয়ারা বেগমসহ পরিবারের একাধিক সদস্যের কবর খনন করেছিলেন। তাই এই দায়িত্বকে তিনি জীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন।

আবু তাহের জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অনেক মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল প্রস্তুত করেছেন। তবে দেশের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কবর খননের দায়িত্ব পালন তার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কবর খননের স্মৃতিও তার মনে এখনও অম্লান।

তোফায়েল আহমেদের ভাগনে মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সবাই তার এই ইচ্ছার বিষয়ে অবগত ছিলেন। মৃত্যুর পর বাবা-মায়ের পাশে সমাহিত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তিনি দীর্ঘদিন ধরে লালন করেছিলেন, পরিবারের সদস্যরা সেটিই বাস্তবায়ন করছেন।

দাফনসংক্রান্ত তথ্য

বিষয়তথ্য
দাফনের স্থানকোড়ালিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান
ইউনিয়নদক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়ন
উপজেলাভোলা সদর
কবরের অবস্থানবাবা আজহার আলী ও মা ফাতেমা খানমের কবরের পাশে
প্রথম জানাজাভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ
দ্বিতীয় জানাজানিজ বাড়ির সামনে
কবর খননের দায়িত্বেআবু তাহের (৭০)

তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সুপরিচিত নাম। তিনি ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে এসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাজনীতির ব্যস্ত পরিসরের বাইরে তিনি পরিবার ও জন্মভূমির প্রতি গভীর টান অনুভব করতেন। মৃত্যুর পর বাবা-মায়ের পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা সেই পারিবারিক বন্ধন ও শিকড়ের প্রতি তার ভালোবাসারই প্রতিফলন। তার দাফনের মধ্য দিয়ে শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের জীবনের সমাপ্তিই নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও অবসান ঘটছে। একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার বহুদিনের লালিত শেষ ইচ্ছা—নিজের আপনজনদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।