পারিবারিক কলহের জেরে নাটোরে মাকে হত্যা: মেজো ছেলে ও নাতি গ্রেফতার

নাটেরের সিংড়ায় পারিবারিক কলহের জেরে মারিয়া বেগম ওরফে শরিফা (৭৫) নামের এক বৃদ্ধাকে গলাটিপে হত্যার পর লাশ গুম করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। বড় ছেলের পক্ষ নেওয়ায় নিজ মাকে হত্যা করেন মেজো ছেলে জনাব আলী (৫৫)। পরবর্তীতে দুর্গন্ধ এড়াতে এই লাশ গুম করতে সহযোগিতা করেন জনাব আলীর ছেলে আল আমিন (২৫)। পুলিশ দীর্ঘ ১৫ দিন পর গত ৯ জুন নিহতের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় ঘাতক ছেলে ও নাতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও হত্যাকাণ্ড

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ মে নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শেরকোল ইউনিয়নের আগপাড়া শেরকোল গ্রামে বাড়ির সীমানায় টয়লেটের (পায়খানা) একটি গর্ত করা নিয়ে বড় ভাই শহিদুল ইসলামের সঙ্গে মেজো ভাই জনাব আলীর কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় মা মারিয়া বেগম যৌক্তিক কারণে বড় ছেলে শহিদুলের পক্ষ নেন। মেজো ছেলে জনাব আলী বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেননি এবং মায়ের ওপর তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে গত ২৫ মে রাত ৯টায় জনাব আলী তার মাকে গলাটিপে হত্যা করেন।

লাশ গুমের বিবরণ

হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধ আড়াল করতে জনাব আলী তাৎক্ষণিকভাবে মায়ের লাশটি সেই টয়লেটের গর্তেই ফেলে দেন এবং ওপর থেকে স্লাব দিয়ে ঢেকে রাখেন। এর ১০ দিন পর (৪ জুন) লাশটি পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে, তিনি গভীর রাতে লাশটি বস্তাবন্দি করেন। এরপর বাড়ির পাশের একটি কচুরিপানার ডোবায় তা ফেলে দেন। এই কাজে জনাব আলীকে সরাসরি সহযোগিতা করেন তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে আল আমিন।

ঘটনার বিবরণী ও কালপঞ্জি

তারিখ (সময়কাল)ঘটনার বিবরণ
২৩ মেবাড়ির সীমানায় টয়লেটের গর্ত করা নিয়ে দুই ভাইয়ের বিতর্ক এবং মায়ের বড় ছেলের পক্ষ অবলম্বন।
২৫ মে (রাত ৯টা)ক্ষোভের জেরে মেজো ছেলে জনাব আলী কর্তৃক মা মারিয়া বেগমকে গলাটিপে হত্যা ও টয়লেটের গর্তে লাশ গোপন।
৪ জুনলাশের দুর্গন্ধ ছড়ালে বস্তাবন্দি করে নাতি আল আমিনের সহযোগিতায় পাশের কচুরিপানার ডোবায় নিক্ষেপ।
৬ জুনমায়ের নিখোঁজের বিষয়ে সিংড়া থানায় নিহতের মেয়ে মর্জিনা বেগমের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের।
৯ জুনজিডির সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে ডোবা থেকে পুলিশের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার ও মর্গে প্রেরণ।

পুলিশি তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা

মায়ের নিখোঁজের পর গত ৬ জুন নিহতের মেয়ে মর্জিনা বেগম সিংড়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এই জিডির সূত্র ধরে তদন্তে নামে পুলিশ। গত ৯ জুন মেজো ছেলে জনাব আলীর বাড়ির পাশের ডোবা থেকে তল্লাশি চালিয়ে মারিয়া বেগমের বস্তাবন্দি গলিত লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহতের চার ছেলেসহ নিকটাত্মীয়দের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হয়। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জনাব আলী একাই করলেও, লাশ সরাতে ও গুম করতে সহযোগিতা করায় তার ছেলে আল আমিনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

এই বিষয়ে সিংড়া থানা চত্বরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নাটোর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ শরিফুল হক গণমাধ্যমকর্মীদের বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন সিংড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর মোহাম্মদ আলী, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম এবং পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম। সিংড়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, নিহতের মেয়ে মর্জিনা বেগম বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন এবং গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।