জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুলাই ২০২৬, ১০:৫০ পিএম

আর্থিক সংকটে পড়ে একীভূত হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে এসব ব্যাংকের গ্রাহকেরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে নগদ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। উত্তোলনের এই সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় জনবান্ধব এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এর আগে নিয়ম ছিল, আমানতকারীরা কেবলমাত্র নিজেদের ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তুলতে পারতেন। তবে নতুন নির্দেশনায় এই সুযোগের আওতা বেশ সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এখন থেকে নিজের পাশাপাশি গ্রাহকের বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং ভাইবোনের যেকোনো জরুরি চিকিৎসায় এই জমানো টাকা ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে চিকিৎসার বাইরে হঠাৎ তৈরি হওয়া অন্যান্য জরুরি পারিবারিক খরচ মেটানোর ক্ষেত্রেও আমানতকারীরা এই সুবিধার আওতায় টাকা তুলতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের টাকা আটকে থাকায় অসংখ্য গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে ছিলেন। অনেকেই নিজের বাইরে পরিবারের অন্য সদস্যদের অসুস্থতায় অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। আবার অনেকের হঠাৎ করে বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হলেও আগের স্কিমে তা তোলার কোনো বৈধ সুযোগ ছিল না। সাধারণ আমানতকারীদের এই মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করেই মূলত আগের আদেশে সংশোধন আনা হয়েছে।
এই সুবিধাটি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। গত বছর দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে অন্তর্বর্তী সরকার আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সব কটি ব্যাংক মিলিয়ে নতুন যে প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়েছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’।
নতুন এই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই মূলধনের মধ্যে সরকার সরাসরি জোগান দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের ভরসা ফেরাতে আমানত বিমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই তহবিল থেকে ছোট আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার একটি কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ৮ লাখ ২২ হাজার সাধারণ আমানতকারী তাদের জমানো টাকা ফেরত পেয়েছেন। তাদের মাঝে মোট ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। শুধুমাত্র ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেই ব্যাংকটির প্রায় সাড়ে ৩ লাখ গ্রাহক ইতিমধ্যে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ফেরত পেয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা হলেও আস্থার সঞ্চার করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে জামানত বা মর্টগেজ রয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকার। আনুপাতিক হারে যা মোট ঋণের মাত্র ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের একটি বিশাল অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যার পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের এই বিশাল পাহাড় ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নামিয়েছিল। জামানতের ঘাটতি থাকায় আইনি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ আদায় করাটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
| বিবরণ | তথ্য বা পরিমাণ |
| একীভূত হওয়া ব্যাংকের সংখ্যা | ৫টি |
| একীভূত নতুন ব্যাংকের নাম | সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক |
| নগদ উত্তোলনের নতুন সর্বোচ্চ সীমা | ১০ লাখ টাকা |
| নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন | ৩৫,০০০ কোটি টাকা |
| মূলধনে সরকারের জোগান | ২০,০০০ কোটি টাকা |
| আমানতকারীদের শেয়ারের পরিমাণ | ১৫,০০০ কোটি টাকা |
| বিমা তহবিল থেকে বিশেষ বরাদ্দ | ১২,০০০ কোটি টাকা |
| সাধারণ গ্রাহকের আমানত ফেরতের সীমা | সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা |
| সুবিধা পাওয়া মোট আমানতকারী | ৮ লাখ ২২ হাজার জন |
| মোট পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ | ৩,৮৮৭ কোটি টাকা |
| ফার্স্ট সিকিউরিটির সুবিধাভোগী গ্রাহক | ৩ লাখ ৫০ হাজার জন |
| ফার্স্ট সিকিউরিটির গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া অর্থ | ১,৬০০ কোটি টাকা |
| ৫ ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি | ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা |
| বিপরীতে রাখা মোট জামানত | ৪৭,৯০০ কোটি টাকা |
| খেলাপি ঋণের পরিমাণ | ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা |
| মোট ঋণে খেলাপির হার | ৮৭.৪৩ শতাংশ |
মন্তব্য