খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ১:৫৬ এএম

স্মরণ
বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অরুনা আসফ আলী এক অনন্য সাহসী নারীর নাম। অসীম সাহস, আপসহীন সংগ্রামী চেতনা এবং দেশপ্রেমের জন্য তিনি ইতিহাসে ‘অগ্নিকন্যা’ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯০৯ সালের ১৬ জুলাই পাঞ্জাবের কালকায় এক শিক্ষিত ও প্রগতিশীল ব্রাহ্ম পরিবারে তাঁর জন্ম। জন্মনাম ছিল অরুণা গঙ্গোপাধ্যায়। পিতা উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এবং মাতা অম্বালিকা দেবী। তাঁদের আদি পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশের বরিশালে।
পারিবারিকভাবেও তিনি ছিলেন এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। তাঁর কাকা অধ্যাপক নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা মীরা দেবীর স্বামী। অপর কাকা ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ‘বোম্বে টকিজ’-এর সঙ্গে যুক্ত খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক।
১৯২৮ সালে তিনি বিশিষ্ট আইনজীবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কংগ্রেস নেতা আসফ আলীকে বিয়ে করেন। এই আন্তধর্মীয় বিয়ে সে সময় সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। পারিবারিক বিরোধিতা এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, তাঁকে মৃত ঘোষণা করে প্রতীকী শ্রাদ্ধ পর্যন্ত করা হয়। বিবাহের পর তাঁর নাম হয় অরুনা আসফ আলী।
অরুনার স্বামী আসফ আলী ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা। স্বাধীনতার পর তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং পরবর্তীতে উড়িষ্যার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিয়ের পর থেকেই অরুনা সক্রিয়ভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন। মহাত্মা গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকারের হাতে গ্রেফতার হন। কারামুক্তির পরও তিনি সংগ্রাম থামাননি। ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এ নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে আবারও তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৪৪ সালে তিনি ‘ইনকিলাব’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে স্বাধীনতার বার্তা ও বিপ্লবী চেতনায় দেশের তরুণ সমাজকে উজ্জীবিত করতে থাকেন। তাঁর দুর্বার নেতৃত্বে আতঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেফতারের জন্য মাথার দাম পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণা করেছিল।
স্বাধীনতার পরও তিনি জনকল্যাণ ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫০ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সামাজিক ন্যায় ও গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৫ সালে লেনিন শান্তি পুরস্কার, ১৯৯২ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ এবং ১৯৯৭ সালে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়।
১৯৯৬ সালের ২৯ জুলাই এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী ও অগ্নিকন্যা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। স্বাধীনতার জন্য তাঁর ত্যাগ, সাহস এবং আপসহীন সংগ্রাম প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগাবে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, অগ্নিকন্যা অরুনা আসফ আলী।
মন্তব্য