নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদে বিএনপি নেতাকে মারধর, বহিষ্কার ৪

নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলাকালীন মো. অকিল উদ্দিন ভূঁইয়া নামের এক জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতাকে মারধর করেছেন যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মী। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে চারজন যুবদল কর্মীকে তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদল। ২০২৬ সালের ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে এই মারধরের ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং হামলার বিবরণ

হামলার শিকার মো. অকিল উদ্দিন ভূঁইয়া নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, জেলা যুবদল থেকে বহিষ্কৃত চার কর্মী হলেন—ফতুল্লা থানার এনায়েত নগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদল নেতা মামুন, কাওসার, শ্রী নিতাই এবং মো. দেলোয়ার হোসেন।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে এক বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষমেলা, বইমেলা এবং শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব চলাকালীন মঞ্চের সামনের সারিতে দাঁড়ানো এবং অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অকিল উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে কয়েকজন যুবদল কর্মীর তীব্র বাগবিতণ্ডা ও তর্কের সৃষ্টি হয়। তবে সেই মুহূর্তে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থাকা দলের জ্যেষ্ঠ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন এবং পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত করতে সক্ষম হন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও এবং মূল বিরোধ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের বর্তমান সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনিকে উদ্দেশ করে অকিল উদ্দিন ভূঁইয়া উপস্থিত নেতাকর্মীদের সামনে ‘গত ১৪ বছর আপনারা কী করেছেন’—এমন একটি মন্তব্য ছুড়ে দেন। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মন্তব্যটি শোনার পর জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনি চরম ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হন। পরবর্তীতে মশিউর রহমান রনির অনুসারী হিসেবে পরিচিত যুবদলের কর্মীরা এই মন্তব্যের বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, এরপর দুপুর ২টার দিকে শাহাদাতবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শেষ করে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় অকিল উদ্দিন ভূঁইয়ার ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। আক্রমণকারী যুবদল কর্মীরা তাকে ঘেরাও করে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে শুরু করে। এই আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার কারণে প্রবীণ এই বিএনপি নেতার ঠোঁট ফেটে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত হন। একই সঙ্গে হামলাকারীরা টানাটানি করে তার গায়ের পরিধেয় বস্ত্র বা জামা ছিঁড়ে ফেলে।

ভুক্তভোগী ও প্রশাসনের বক্তব্য এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা

সহিংস এই ঘটনার পর ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, জেলা পরিষদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সরকারি স্থানে এ ধরনের উশৃঙ্খল ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘটনার সময়কার ভিডিও ফুটেজগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং হামলাকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে অতিসত্বর প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিএনপি কোনো সন্ত্রাসীদের দল নয় এবং এখানে কোনো প্রকার সন্ত্রাসীকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

হামলার শিকার ভুক্তভোগী বিএনপি নেতা অকিল উদ্দিন ভূঁইয়া গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলাকালে মশিউর রহমান রনির সঙ্গে তাঁর কেবল মৌখিক তর্কবিতর্ক হয়েছিল। তবে উপস্থিত সিনিয়র নেতারা বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে মীমাংসা করে দিয়েছিলেন। এরপর জেলা পরিষদের প্রশাসকের কক্ষ থেকে তিনি এবং মশিউর রহমান রনি একসঙ্গেই নিচে নেমেছিলেন। কিন্তু নিচে নামার পরপরই রনির অনুসারী কর্মীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁর ওপর এই হামলাটি চালায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, জেলা পরিষদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনসমক্ষে যারা এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা চরম অন্যায় করেছে। সংগঠনের ভাবমূর্তি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। সেই কারণে ঘটনার সাথে জড়িত ও অভিযুক্ত চারজন কর্মীকে যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল স্তরের সাংগঠনিক পদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে।