বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে বিভিন্ন জ্বালানি সংস্থাকে মোট ৫৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ঋণ হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ (ডিওই)। মূলত ইরান ও ইসরায়েল কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করতেই এই জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
Table of Contents
বাজারের অস্থিরতা ও মার্কিন উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনা, বিশেষ করে ইরানের সাথে সংশ্লিষ্ট সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একটি বৈশ্বিক চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সংরক্ষিত ভাণ্ডার থেকে তেল ছাড় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, এটি তাদের বৃহত্তর কৌশলের একটি অংশ যার লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে মোট ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়ে পরিস্থিতির ভারসাম্য রক্ষা করা।
পূর্ববর্তী ঋণ ও কোম্পানিগুলোর অবস্থান
উল্লেখ্য যে, বর্তমান সংকটের শুরু থেকেই মার্কিন প্রশাসন তেলের বাজার পর্যবেক্ষণে রেখেছে। গত মাসেই জ্বালানি বিভাগ (ডিওই) ৯টি শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি কোম্পানিকে মোট ৯২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল ঋণ হিসেবে প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক্সন মবিল, ট্রাফিগুরা এবং ম্যারাথন পেট্রোলিয়ামের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বরাদ্দকৃত তেলের মাত্র ৫৮ শতাংশ গ্রহণ বা ব্যবহার করেছে। অবশিষ্ট তেল ব্যবহারের সুযোগ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতেই নতুন করে ৫৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেলের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নিচে মার্কিন জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক তেল ঋণ সংক্রান্ত তথ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়বস্তু | বিবরণ ও পরিমাণ |
| সর্বশেষ ঘোষিত তেল ঋণের পরিমাণ | ৫৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল |
| গত মাসে প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ | ৯২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল |
| কোম্পানিগুলো কর্তৃক ব্যবহৃত তেলের হার | ৫৮ শতাংশ |
| কৌশলগত রিজার্ভ থেকে মোট ছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা | ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল |
| মূল সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানসমূহ | এক্সন মবিল, ট্রাফিগুরা, ম্যারাথন পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি |
| পদক্ষেপের মূল কারণ | ইরান-যুদ্ধ কেন্দ্রিক সরবরাহ ঘাটতি ও দাম নিয়ন্ত্রণ |
কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের গুরুত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (Strategic Petroleum Reserve – SPR) হলো বিশ্বের বৃহত্তম জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুদ। এটি সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া বা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময় ব্যবহার করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই তেল ঋণের সিদ্ধান্ত মূলত ‘এক্সচেঞ্জ’ বা বিনিময় চুক্তির আওতায় পড়ে, যেখানে কোম্পানিগুলো এখন তেল গ্রহণ করলেও ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমপরিমাণ তেল (এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রিমিয়ামসহ) আবার রিজার্ভে ফেরত দিতে বাধ্য থাকে।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে আসার ফলে পাইকারি বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে, যা পর্যায়ক্রমে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য পেট্রোল ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্য হ্রাসে সহায়তা করবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ওপেক (OPEC) প্লাস দেশগুলোর উৎপাদন নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে। মার্কিন সরকারের এই হস্তক্ষেপ সাময়িকভাবে তেলের ঘাটতি পূরণ করলেও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য বৈশ্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
