যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের এভারেট শহরে কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা দুটি নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায়। দীর্ঘ ৪০ বছর পর অপরাধীকে শনাক্ত করতে তদন্তকারীরা এক অনন্য ও অভিনব ‘চুইংগাম কৌশল’ ব্যবহার করেছেন। এই ঘটনার মূল নায়ক ৬৮ বছর বয়সী মিচেল গ্যাফ, যিনি সম্প্রতি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ নীরবতা
১৯৮০ এবং ১৯৮৪ সালে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে জুডি উইভার ও সুসান ভেসি নামে দুই নারী পৃথকভাবে হত্যার শিকার হন। তৎকালীন ফরেনসিক প্রযুক্তি উন্নত না হওয়ায় পুলিশ এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেনি। মামলার নথিপত্র অনুসারে, অপরাধের ধরন ছিল ভয়াবহ:
সুসান ভেসি (১৯৮০): জুলাই মাসে ২১ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী সুসানকে তাঁর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। গ্যাফ এলোমেলোভাবে খোলা দরজা খুঁজছিলেন এবং সুসানের বাড়ি পেয়ে ভেতরে ঢুকে এই নৃশংসতা চালান।
জুডি উইভার (১৯৮৪): জুনে ৪২ বছর বয়সী জুডিকে তাঁর শোবার ঘরে আক্রমণ করেন গ্যাফ। হত্যার পর প্রমাণ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে তিনি ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
ফরেনসিক বিজ্ঞানের বিবর্তন ও অগ্রগতি
তদন্তকারীরা আশির দশকেই জুডি উইভারের দেহ থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে প্রযুক্তির উন্নতির অপেক্ষায় সংরক্ষিত ছিল। ২০২০ সালে উন্নত ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং জেনেটিক জিনোলোজি ব্যবহার করে তদন্ত পুনরায় শুরু হয়। ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা ‘এটিআরমিক্স’ নামক আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে পুরোনো নমুনা থেকে অপরাধীর ডিএনএ আলাদা করতে সক্ষম হন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এই ডিএনএ প্রোফাইলটি জাতীয় অপরাধী তথ্যভাণ্ডারের (কম্বাইন্ড ডিএনএ ইনডেক্স সিস্টেম) সঙ্গে মিলে যায়।
টেবিল: মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য ও অগ্রগতির সময়রেখা
| বিবরণ | তথ্য ও তারিখ |
| প্রথম হত্যাকাণ্ড (সুসান ভেসি) | জুলাই, ১৯৮০ |
| দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ড (জুডি উইভার) | জুন, ১৯৮৪ |
| সন্দেহভাজন শনাক্তকরণ (ডিএনএ ম্যাচ) | নভেম্বর, ২০২৩ |
| ছদ্মবেশী চুইংগাম অভিযান | জানুয়ারি, ২০২৪ |
| অপরাধ স্বীকার | ১৬ এপ্রিল, ২০২৪ |
| অপরাধীর নাম ও বর্তমান বয়স | মিচেল গ্যাফ (৬৮ বছর) |
ছদ্মবেশী অভিযান ও ‘চুইংগাম কৌশল’
তথ্যভাণ্ডারে মিচেল গ্যাফের ডিএনএর সন্ধান পাওয়ার পর গোয়েন্দাদের প্রয়োজন ছিল সরাসরি তাঁর শরীর থেকে নেওয়া একটি তাজা নমুনা। পুলিশ কর্মকর্তা সুসান লগোথেটি ও তাঁর সহযোগীরা একটি চুইংগাম কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে গ্যাফের বাড়িতে যান। তাঁরা গ্যাফকে নতুন স্বাদের চুইংগাম পরীক্ষার আমন্ত্রণ জানান। গ্যাফ যখন চুইংগাম চিবিয়ে একটি পাত্রে থুতু ফেলেন, তখন তাঁর লালার সঙ্গেই গোয়েন্দাদের হাতে চলে আসে কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ নমুনা। ল্যাবে পরীক্ষার পর দেখা যায়, এই নমুনার সঙ্গে ৪০ বছর আগের অপরাধস্থলের নমুনার শতভাগ মিল রয়েছে।
অপরাধের স্বীকৃতি ও বিচার
আদালতের নথি অনুযায়ী, গত ১৬ এপ্রিল মিচেল গ্যাফ উভয় হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। এর আগে ১৯৭৯ সালে তিনি জ্যাকলিন ও’ব্রায়েন নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা চালিয়েছিলেন, যিনি অসীম সাহসিকতায় প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হন। ১৯৯৪ সালে তিনি জেল থেকে মুক্তি পেলেও সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই বছরের মে মাসে আদালতের রায়ে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ ৪৪ বছর পর মানসিক শান্তি ও ন্যায়বিচার ফিরে পেল।
আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তি কীভাবে কয়েক দশকের পুরনো অন্ধকার দূর করতে পারে, এই মামলাটি বিশ্বজুড়ে ফরেনসিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
