খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুন ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

ছয় দফা দাবি আদায়ে টানা দুই দিন ধরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার পর এবার চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশন। আজ রোববার সকাল ৮টা থেকে এই কর্মবিরতি কার্যকর করা হয়েছে। একই সাথে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এবং সমমানের দাবিতে সকাল ১১টার পর থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সব ধরনের শিক্ষাদানের ক্লাস বর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
গতকাল শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মো. ইরফানুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই কর্মবিরতি কর্মসূচির বিষয়টি সাধারণ মানুষকে জানানো হয়। নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আজ বেলা ১১টায় হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন আন্দোলনরত চিকিৎসকেরা।
আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের সুনির্দিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় স্নাতকোত্তর চিকিৎসা প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বেশ কিছু নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই নির্দেশনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের নির্দিষ্ট কিছু বিভাগে নতুন পদায়ন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, চিকিৎসকদের জন্য উপজেলা পর্যায়ে টানা দুই বছর বাধ্যতামূলক চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং মেধাভিত্তিক সীমিত ভাতার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকেই চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলন শুরু হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মতে, তাদের ছয়টি দাবির মধ্যে প্রথম দাবির বিষয়ে এক প্রকার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হলেও, বাকি পাঁচটি মূল দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহল থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো বাস্তবমুখী বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে নিজেদের অধিকার আদায়ে বাধ্য হয়েই তারা এই কঠোর কর্মবিরতির পথ বেছে নিয়েছেন।
আন্দোলনরত চিকিৎসকদের উত্থাপিত ছয়টি প্রধান দাবি এবং সেগুলোর যৌক্তিকতা নিচে একটি সারণির মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো:
| দাবি ক্রমিক | আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবি ও বিষয়সমূহ |
| ১ | স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের গত ১৯ মে জারি করা স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নতুন প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনা জারি করা। |
| ২ | দেশের সকল কর্মজীবী চিকিৎসকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ‘স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন’ অনতিবিলম্বে প্রণয়ন করা এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। |
| ৩ | ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বর্তমান মাসিক ভাতা পুনর্নির্ধারণ করে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা করা এবং সরকারি চিকিৎসকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একটি পৃথক বেতনকাঠামো গঠন করা। |
| ৪ | বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) স্বাস্থ্য ক্যাডারে সাধারণ চিকিৎসকদের প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৪ বছর নির্ধারণ করা। |
| ৫ | বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন-২০২৫-কে অস্থায়ী অধ্যাদেশের পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী আইনে রূপান্তর করা এবং সমাজে ভুয়া চিকিৎসক পরিচয়দানকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। |
| ৬ | বিএমডিসি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া সকল প্রকার স্নাতকোত্তর ও উচ্চতর ভর্তি পরীক্ষার ফি সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। |
উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, গত ১৯ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিতর্কিত নীতিমালাটি জারির পর সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং উচ্চপদস্থ চিকিৎসক কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আপাতত উপজেলা পর্যায়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণের কঠিন শর্তটি বাতিল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, স্নাতকোত্তর প্রথম পর্বে উত্তীর্ণ সকল বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীরা এখন থেকে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলে নিয়মিত সরকারি প্রশিক্ষণ ভাতার আওতাভুক্ত হবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই আংশিক সংশোধনীতে আন্দোলনকারীরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা সাধারণ ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থ বিবেচনা করে প্রথমে কর্মবিরতির মতো কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত ছিলাম এবং কর্মসূচি পিছিয়েছিলাম। প্রশাসনকে আমরা শুরুতে ৪৮ ঘণ্টা এবং পরবর্তীতে আরও ২৪ ঘণ্টা সুনির্দিষ্ট সময় দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের দাবি পূরণে কোনো সদিচ্ছা দেখা যায়নি এবং বর্তমানে আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই অত্যন্ত বাধ্য হয়েই আমাদের এই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করতে হচ্ছে।” দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই টানা কর্মবিরতি ও আন্দোলন কঠোরভাবে চলবে বলে চিকিৎসকেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
মন্তব্য