,

নানকার বিদ্রোহের নেত্রী অপর্ণা পাল চৌধুরী: সাম্য ও নারীমুক্তির স্মারক

বাংলার মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়, প্রথাগত সামন্তবাদের অবসান এবং নারীমুক্তির ইতিহাসে যেসব নাম চিরভাস্বর হয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে বিপ্লবী অপর্ণা পাল চৌধুরী অন্যতম। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্যবাদী রাজনীতি এবং সিলেটের ঐতিহাসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহ—প্রতিটি পর্বেই তিনি সাহসিকতা ও ত্যাগের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

১৯২২ সালে তৎকালীন আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই সংগ্রামী নারী। শৈশব থেকেই প্রথাগত সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার স্পৃহা ছিল তাঁর মধ্যে। ছাত্রজীবনেই তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক সচেতনতার সাথে যুক্ত হন এবং প্রগতিশীল রাজনীতিকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেন। ১৯৪০ সালের ছাত্র আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ছাত্র বিভাগের সম্পাদিকা হিসেবে মূল ধারার রাজনীতিতে নেতৃত্ব প্রদান করেন। সেই সময়ে কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরে ঘুরে সাধারণ নারীদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন মহিলা সমিতি।

১৯৪২ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্যপদ লাভ করেন। পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়। এ সময় তিনি সিলেট অঞ্চলের নানকার প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। নানকার প্রথা ছিল মূলত এক ধরনের মধ্যযুগীয় দাসত্ব, যেখানে জমিদারের জমিতে বসবাসের বিনিময়ে কৃষকদের বিনামূল্যে বিনামূল্যে শ্রম দিতে হতো এবং তাঁদের কোনো জমির অধিকার ছিল না।

অপর্ণা পাল চৌধুরীর সাংগঠনিক দক্ষতায় বিয়ানীবাজারের শানেশ্বর অঞ্চল নানকার আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তিনি মেহনতি নারী ও কৃষকদের সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন পুলিশ ও জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী নির্মম নিপীড়ন চালায়। শানেশ্বরে পুলিশের গুলিতে ছয়জন কৃষক শহীদ হন।

সেই সময় অন্তঃসত্ত্বা থাকা সত্ত্বেও অপর্ণা পাল চৌধুরী আন্দোলন থেকে পিছপা হননি। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর ওপর চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এই বর্বর নির্যাতনের ফলে তাঁর গর্ভপাত ঘটে এবং তিনি আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে শ্রীহট্ট, রাজশাহী এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কাটাতে হয় দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর।

কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও তাঁর আদর্শ দমে যায়নি। ১৯৫৪ সালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসাজনিত ও রাজনৈতিক কারণে তিনি পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে তিনি স্বামী সুরথ পাল চৌধুরীর সাথে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই(এম)-এ যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন সমাজসেবামূলক ও নারী সংগঠনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

রাজনীতি ও সামাজিক কাজের পাশাপাশি তিনি তাঁর অভিজ্ঞতাকে লিখিত রূপ দিয়ে গেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘নারী আন্দোলন: স্মৃতিকথা’ উপমহাদেশে নারীমুক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

১৯৯২ সালের ৬ আগস্ট এই মহীয়সী প্রগতিশীল নেত্রীর জীবনাবসান ঘটে। শারীরিক পঙ্গুত্ব ও দীর্ঘ কারাবরণ সত্ত্বে যে আদর্শের সলতে তিনি জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, তা আজও এদেশের যেকোনো প্রগতিশীল ও সামাজিক মুক্তি সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে।

জীবন ও সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকবিস্তারিত বিবরণ
জন্ম১৯২২ সাল, সিলেট
ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ১৯৪০ সালের আন্দোলন ও ছাত্র বিভাগের সম্পাদিকা নির্বাচন
কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান১৯৪২ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্য লাভ
প্রধান রাজনৈতিক অবদানসিলেট অঞ্চলে নানকার কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিতকরণ
আন্দোলনের মূল কেন্দ্রশানেশ্বর, বিয়ানীবাজার, সিলেট
ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট (পুলিশের গুলিতে ৬ কৃষক শহীদ)
কারাবরণ ও নির্যাতন১৯৪৯-১৯৫৪ (গর্ভপাত, শারীরিক পঙ্গুত্ব ও ৫ বছরের জেল)
দলীয় পুনর্বিন্যাস১৯৬৪ সালে সিপিআই (এম)-এ যোগদান
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ‘নারী আন্দোলন: স্মৃতিকথা’
প্রয়াত১৯৯২ সালের ৬ আগস্ট
Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।