রাজধানীর পল্লবী এলাকায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করার অপরাধে মূল আসামি সোহেল রানা এবং অপরাধে সহায়তাকারী হিসেবে তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দেশের বিচারিক ইতিহাসে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে এই স্পর্শকাতর মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।
রায় ঘোষণা ও আদালতের বিবরণী
আজ রোববার বেলা ১১টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট মামলার রায়ের মূল অংশ পাঠ করা শুরু করেন এবং বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে আসামিদের উপস্থিতিতে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানা করেছেন। এর আগে আজ সকালে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় আসামিদের কারাগার থেকে বিশেষ কয়েদি যানে করে এনে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এর মধ্যে অপর আসামি স্বপ্না আক্তারকে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে এবং প্রধান আসামি সোহেল রানাকে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কয়েদি যান থেকে নামিয়ে হাজতখানায় স্থানান্তর করা হয়েছিল।
মামলার সময়রেখা ও বিচার প্রক্রিয়ার বিবরণ
বিগত ১৯ মে শিশুটি নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আজ বিজ্ঞ আদালত এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করলেন। মামলার সংক্ষিপ্ত বিচারিক ধারা এবং ঘটনার পর্যায়ক্রমিক বিবরণ একটি সারণির মাধ্যমে নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | ঘটনার পর্যায় এবং আইনি পদক্ষেপসমূহ | সুনির্দিষ্ট তারিখ ও বিবরণী |
| ১ | নৃশংস অপরাধ ও লাশ উদ্ধার | গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশুর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। |
| ২ | আসামি আটক ও গ্রেপ্তার | ১৯ মে ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না আক্তার আটক এবং সন্ধ্যায় ফতুল্লা থেকে সোহেল রানা গ্রেপ্তার হন। |
| ৩ | স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি | ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের স্বীকারোক্তি প্রদান। |
| ৪ | আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন | ১ জুন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও বিচার শুরু। |
| ৫ | আইনি যুক্তিতর্ক শুনানি | ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক সমাপ্তি। |
| ৬ | চূড়ান্ত রায় প্রকাশ | ৭ জুন (রোববার) ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ। |
অপরাধের প্রেক্ষাপট ও আসামিদের অবস্থান
গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে যখন ভুক্তভোগী শিশুটির খণ্ডিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, তার পূর্বেই ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা প্রধান আসামি সোহেল রানা শৌচাগারের জানালার লোহার শিকল বা গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে বাসা থেকে তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে নিবিড় অভিযানের মাধ্যমে ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে মূল পলাতক আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর নিহত শিশুটির পিতা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।
বিগত ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে দুই আসামিই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন। গত বৃহস্পতিবার মামলার যুক্তিতর্ক শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে শিশুটির পিতা ও মাতার আবেগঘন সাক্ষ্য পড়ে শোনান। তিনি উল্লেখ করেন যে, সোহেল রানা সরাসরি এই জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এই অপরাধে বাধা না দিয়ে বরং স্বামীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু গণমাধ্যমকে জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির যে দাবি রাষ্ট্রপক্ষ করেছিল, রায়ে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
