বাংলাদেশের চা শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট—এই পাঁচ জেলায় গত বছর চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বর্তমানে দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশই আসছে এই অঞ্চল থেকে, যা উত্তরবঙ্গকে ধীরে ধীরে দেশের চা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে দেশে মোট প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি (৯৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন কেজি) চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলা থেকেই উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার কেজি প্রক্রিয়াজাত চা। ২০০০ সালে এই অঞ্চলে চা চাষ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ উৎপাদন।
এর আগে ২০২৩ সালে এই অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল, যা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ ছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদনে এই বৃদ্ধি উত্তরাঞ্চলে চা শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণেরই ইঙ্গিত দেয়।
Table of Contents
জাতীয় উৎপাদনে উত্তরাঞ্চলের অবদান
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| দেশে মোট চা উৎপাদন | প্রায় ৯৪.৯ মিলিয়ন কেজি |
| উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার উৎপাদন | প্রায় ২০.২৪ মিলিয়ন কেজি |
| জাতীয় উৎপাদনে অংশ | প্রায় ২১% |
| আগের রেকর্ড (২০২৩) | ১৭.৯৫ মিলিয়ন কেজি |
বর্তমানে এই পাঁচ জেলায় চা শিল্পের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৫ একরের বেশি আয়তনের ১২টি নিবন্ধিত এবং ১৮টি অনিবন্ধিত বড় চা বাগান রয়েছে। পাশাপাশি ২৫ একরের কম আয়তনের ২,২২৫টি নিবন্ধিত এবং ৬,১৪৬টি অনিবন্ধিত ছোট চা বাগান রয়েছে। এসব বাগান স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
জেলাভিত্তিক চা চাষের জমি
| জেলা | আবাদি জমি (একর) |
|---|---|
| পঞ্চগড় | ৯,৮১৯.৭৩ |
| ঠাকুরগাঁও | ১,৪৫৭ |
| লালমনিরহাট | ১২৪.৮২ |
| দিনাজপুর | ১৩০ |
| নীলফামারী | ৬৭.৯২ |
২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৩ একর বেশি জমিতে চা চাষ হয়েছে। বর্তমানে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৬০০ একরে পৌঁছেছে।
সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো
যদিও বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে কয়েক বছর আগে এই খাতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। ২০২৩ সালে প্রায় ১২ হাজার ১৩২ একর জমিতে চা চাষ হলেও কাঁচা পাতার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েন। এর ফলে ২০২৪ সালে চা চাষের জমি কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫২৭ একরে। অনেক কৃষক তখন হতাশ হয়ে বাগান উপড়ে ফেলেন।
পরবর্তীতে চা বোর্ড পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, অনেক চাষি অনুমোদিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছিলেন। মৌসুমে যেখানে তিনবার সার প্রয়োগের নিয়ম, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে সাত থেকে আটবার সার দেওয়া হচ্ছিল। এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছিল।
অন্যদিকে কিছু কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ঠিকমতো অনুসরণ করা হচ্ছিল না। বিশেষ করে ‘উইদারিং’ বা চা পাতা শুকানোর প্রাথমিক ধাপ অনেক ক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হচ্ছিল। ফলে একই পরিমাণ চা প্রক্রিয়াজাত করতে যন্ত্রপাতি প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত চালাতে হতো।
পরবর্তীতে এই ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ শুরু করলে একই পরিমাণ চা প্রক্রিয়াজাত করতে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ কমেছে এবং চায়ের মানও উন্নত হয়েছে।
দাম বাড়ায় ফিরেছে চাষিদের আস্থা
চা শিল্পে নতুন করে প্রাণ ফিরেছে মূলত বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে। পঞ্চগড়ে ২০২৫ সালে নিলামে প্রক্রিয়াজাত চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ২৪২ টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ১৬২ টাকা।
একই সঙ্গে কাঁচা চা পাতার দামও বেড়েছে। ২০২৪ সালে কেজিপ্রতি সরকারি মূল্য ছিল ১৮ টাকা, কিন্তু বাজারে তা নেমে গিয়েছিল ৮ থেকে ১০ টাকায়। ২০২৫ সালে চাহিদা বাড়ার কারণে অনেক চাষি কেজিপ্রতি প্রায় ৩৮ টাকা পর্যন্ত দামে কাঁচা পাতা বিক্রি করতে পেরেছেন।
অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি
চা শিল্পের প্রসারে অবকাঠামোগত উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়েছে, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে মোট ৫২টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি পঞ্চগড়ে এবং একটি ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থিত।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রোসেয়া গ্রামের কৃষক হুমায়ুন খালেদ দেড় একর জমিতে চা চাষ করেন। টানা তিন বছর লোকসানের পর সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে তিনি প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ করেছেন।
তার ভাষায়, হতাশার কারণে একসময় বাগানের ঠিকমতো যত্ন নেননি। তবে এখন পরিস্থিতি উন্নত হওয়ায় তিনি আবার নতুন করে বাগানের পরিচর্যা শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে এই জমি থেকেই বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ করার আশা করছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উন্নত চাষপদ্ধতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে উত্তরাঞ্চল আগামী দিনে দেশের চা শিল্পে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
