খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ৬:১৬ পিএম

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়ম মেনেই এখন ক্লাস হয়, বাজে স্কুলের ঘণ্টা। শিক্ষার্থীরা বই-খাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যায়, ছুটি শেষে বাড়ি ফেরে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও এক বছর আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মনে গভীর দাগ হয়ে আছে। কারও শরীরে রয়ে গেছে আগুনে পোড়া ক্ষত, কারও মনে জমে আছে আতঙ্ক ও শোক। ২১ জুলাই এলেই সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি আবারও সামনে চলে আসে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, সোমবার। সেদিনও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে অন্য দিনের মতোই চলছিল পাঠদান। কলেজের প্রজেক্ট-২ ভবনের বিভিন্ন কক্ষে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছিল। প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষগুলোতেও ছিল শিশুদের ব্যস্ততা। কারও হাতে খাতা, কারও হাতে কলম। বইভর্তি ব্যাগ নিয়ে তারা অপেক্ষা করছিল ছুটির সময়ের।
দুপুর ১টার দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটির সময় ঘনিয়ে আসে। এর কয়েক মিনিট পরই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকার বিমানবাহিনী ঘাঁটি বীর উত্তম এ কে খন্দকার থেকে বেলা ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়ন করে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিমানটি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়।
বিমানটির ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো ক্যাম্পাসের চিত্র। বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের সামনের অংশ ভবনের সিঁড়ির কাছে গিয়ে আঘাত হানে। দুই পাখার আঘাত ও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু শিক্ষার্থীদের দুটি শ্রেণিকক্ষ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া ও ধুলা। আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। শুরু হয় চিৎকার, কান্না ও আর্তনাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণচঞ্চল শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয় এক ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে।
দুর্ঘটনায় পাইলট, একজন শিক্ষিকা এবং ২৮ শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী। দুর্ঘটনার পর আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধদের চিকিৎসা দেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে শারীরিক ক্ষত শুকিয়ে গেলেও অনেকের মনে সেই দিনের ভয়াবহতা এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
আগুনে পুড়ে কয়েকজন নিহতের মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করে। এরপর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখনও সেই স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইমুল হাসান আদিত জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি বিধ্বস্ত ভবন থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে ছিলেন। চোখের সামনে বিকট শব্দে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে এবং সহপাঠীদের আগুনে পুড়ে যেতে দেখেন তিনি। সেই দৃশ্যের ভয়াবহতা তাকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে। রাতে ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কে জেগে উঠতেন। সন্তানের মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তার পরিবার তাকে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত সহপাঠীদের স্মৃতি ও নিজের টানের কারণে তিনি মাইলস্টোনেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দুর্ঘটনার সময় বিধ্বস্ত ভবনে থাকা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরাও গুরুতর আহত হয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। দুর্ঘটনার পর দুই মাস সাত দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছে তাকে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পরও দীর্ঘদিন ভয় ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল সে। স্কুল আবার খুললে ধীরে ধীরে শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে আলভীরা। এখন আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হলেও হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা মনে পড়লে তার কষ্ট হয়। বিশেষ করে বন্ধু আয়মানের কথা এখনও তার মনে পড়ে।
এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্তর চিকিৎসাও ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। তার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যায়। তাকে ৯৭ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। চিকিৎসার সময় তার ৩৬টি অস্ত্রোপচার এবং আটবার স্কিন গ্রাফটিং করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তার এই লড়াই দুর্ঘটনার পর বেঁচে যাওয়া আহত শিক্ষার্থীদের সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
তবে শুধু শারীরিক চিকিৎসাই নয়, দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মানসিক পুনর্বাসনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকদের ভাষ্য, অনেক আহত শিক্ষার্থী এখনও হঠাৎ রেগে যায়, বিরক্ত হয়ে পড়ে কিংবা কোনো বিষয়ে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। আকাশে বিমানের শব্দ শুনলে কেউ কেউ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, কান চেপে ধরে। অনেকে ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। আবার কেউ কেউ মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে।
সন্তান হারানো পরিবারগুলোর কাছে এই এক বছর ছিল অসীম শোকের সময়। প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট ঘটনা তাদের হারানো সন্তানদের কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্য শিশুরা যখন সকালে স্কুলের পোশাক পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়, তখন সন্তানহারা বাবা-মায়ের কাছে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে গভীর বেদনার কারণ।
স্বজনদের অনেকেই মনে করেন, কোনো আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণই সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। সরকার ঘোষিত ২০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়েও কয়েকটি পরিবার আপত্তি জানিয়েছে এবং কেউ কেউ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে স্বজনেরা দাবি করেছেন।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবার, আহত শিক্ষার্থী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ২১ জুলাই এখনও একটি শোকাবহ দিন। সেই দিনের স্মৃতি তাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। আহতদের কেউ শরীরে ক্ষতচিহ্ন বহন করছেন, কেউ লড়াই করছেন মানসিক ট্রমার সঙ্গে, আর সন্তান হারানো পরিবারগুলো বয়ে চলেছে অপূরণীয় শূন্যতা।
এর মধ্যেই স্কুলের পাশে দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি পড়ে থাকা নিয়েও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে। তাদের মতে, ধ্বংসাবশেষটি চোখে পড়লেই অনেকের মনে সেই ভয়াবহ দিনের দৃশ্য ফিরে আসে। ফলে এক বছর পরও মাইলস্টোনের জন্য ২১ জুলাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি শোক, স্মৃতি, বেদনা এবং বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামের এক অনন্ত প্রতীক।
মন্তব্য