খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ৪:১১ পিএম

আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে যে কজন কবি নিজস্ব ভাষা, স্বতন্ত্র কাব্যভঙ্গি এবং গ্রামীণ জনজীবনের অনন্য শিল্পরূপ নির্মাণ করে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম কবি আল মাহমুদ। প্রেম, প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাংস্কৃতিক চেতনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণে তিনি বাংলা কবিতাকে এনে দিয়েছেন এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা। তাঁর কবিতায় যেমন বাংলার মাটি, নদী, কৃষক ও অবহেলিত জনপদের ঘ্রাণ মিশে আছে, তেমনি রয়েছে মানুষের চিরন্তন প্রেম, বিরহ, বেদনা ও আত্মপরিচয়ের সামগ্রিক অনুসন্ধান। আজ এই মহান সাধকের জন্মজয়ন্তীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছে এ দেশের সাহিত্য অনুরাগী মানুষ।
১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আল মাহমুদ। তাঁর পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। শৈশব থেকেই স্থানীয় প্রকৃতির মায়ায় এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি এক গভীর অনুরাগে বেড়ে ওঠেন তিনি। পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর জোরালো আবির্ভাব ঘটে। সমকালীন বাংলা কবিতার জগতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অন্যতম শক্তিশালী ও মৌলিক কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
১৯৬৩ সালে কবি আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয়। এই একটিমাত্র গ্রন্থেই তাঁর নিজস্ব ও মৌলিক কাব্যভাষার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সুধী মহলের নজর কাড়ে। এরপর ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘কালের কলস’। তবে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’ তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক চিরস্থায়ী ও অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে। ‘সোনালি কাবিন’ সোনেটের ফর্মে লেখা বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলন হিসেবে আজও সাধারণ পাঠক, গবেষক ও সমালোচকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। এই গ্রন্থের প্রতিটি চরণে প্রেম, লোকজ জীবন, বাংলার ঐতিহ্য ও দীর্ঘ ইতিহাস এক অনন্য শিল্পসৌন্দর্যে ডানা মেলেছে।
পেশাগত জীবনে আল মাহমুদ দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং প্রবাসী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই অবসরে যান।
কবিতা ছাড়াও আল মাহমুদ ছিলেন একজন অত্যন্ত শক্তিশালী ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সফল আত্মজীবনীকার। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘একচক্ষু হরিণ’ এবং ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’। উপন্যাসেও তিনি তাঁর স্বকীয়তার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর লেখা ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকী’, ‘আগুনের মেয়ে’ ও ‘চতুরঙ্গ’ পাঠকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে তাঁর ছোটগল্প সংকলন ‘পানকৌড়ির রক্ত’ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাহিত্যে অনন্য ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আল মাহমুদ তাঁর জীবনে অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬৮ সালে তিনি লাভ করেন দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’। এরপর ১৯৮৭ সালে তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) সাহিত্য পুরস্কার এবং কলকাতার ভানুসিংহ সম্মাননাসহ বহু সম্মানে ভূষিত হন।
আল মাহমুদের সাহিত্যজীবন যেমন ছিল তুমুল সৃজনময়, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবন ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক-আদর্শিক অবস্থান ছিল নানা বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনায় ভরপুর। তবে মতাদর্শগত ভিন্নতা কিংবা রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অসামান্য কাব্যপ্রতিভা এবং অনন্য শিল্পসৃষ্টির মূল্য আজও অনস্বীকার্য। বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে তাঁর অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে ঢাকায় এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহাকালের নিয়মে কবির শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও প্রকৃত শিল্পীর কখনো মৃত্যু হয় না, তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিতে। ‘সোনালি কাবিন’-এর জনক আল মাহমুদও বেঁচে থাকবেন বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতা এবং কোটি পাঠকের হৃদয়ে—যতদিন এই পৃথিবীতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য টিকে থাকবে। এই গুণী স্রষ্টার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
মন্তব্য