খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ১২:৪ পিএম

দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও শিশুতোষ সৃজনশীলতার অন্যতম অগ্রদূত মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন এই বরেণ্য শিল্পী। চলতি মাসের ১৪ তারিখে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী রুবেল মিয়া জানান, হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হবে। এরপর ধানমন্ডি ১ নম্বরে তাঁর নিজ বাসভবনে রাখা হবে, যাতে স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। জানাজা ও দাফনের স্থান ও সময় পরে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হবে।
বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই নন, ছিলেন শিক্ষাবিদ, সংগঠক, টেলিভিশন নির্মাতা, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ এবং শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশে নিবেদিতপ্রাণ একজন সংস্কৃতিকর্মী। দেশে তাঁকে ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ নামেই অধিক পরিচিত করা হয়।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়। কর্মজীবনে তিনি আরও বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন।
শৈশব থেকেই ছবি আঁকা ও সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। ছাত্রজীবনেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছবি আঁকার কারণে কারাবরণও করতে হয় তাঁকে। দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা পরবর্তী জীবনের শিল্পচর্চায়ও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের নকশার অন্যতম স্থপতি ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। পাশাপাশি তিনি সৃষ্টি করেছেন জনপ্রিয় শিশুতোষ চরিত্র ‘পারুল’। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিশুতোষ চরিত্র ‘মীনা’-এর সঙ্গেও তিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত ছিলেন। শিশুদের জন্য মানসম্মত টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর পরিকল্পনা ও নির্মাণে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের অন্যতম জনপ্রিয় মঞ্চ হিসেবে পরিচিতি পায়। একইভাবে তাঁর নির্মিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানও দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
পেশাজীবনের শুরুতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি) এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি দেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধও তাঁর শিল্পচিন্তাকে নতুন মাত্রা দেয়। ভারতের শরণার্থীশিবিরে যুদ্ধাহত ও আতঙ্কগ্রস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি প্রথমবারের মতো পাপেট শোর আয়োজন করেন। সেই উদ্যোগই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের ভিত্তি গড়ে তোলে। স্বাধীনতার পর তিনি পাপেটকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তাঁর শিল্পকর্ম, সৃজনশীল উদ্যোগ এবং শিশুদের জন্য গড়ে তোলা নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মন্তব্য