খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৩:১০ পিএম

তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়ায় কিউবাজুড়ে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। সোমবার (৬ জুলাই) দেশটির প্রায় এক কোটি মানুষ হঠাৎ করেই বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। রাজধানী হাভানাসহ বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পরিবহন, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আর হাসপাতালগুলো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমিত সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে।
কিউবা সরকার জানিয়েছে, জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে। তবে কখন পুরো গ্রিড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান ‘ইলেকট্রিক ইউনিয়ন’ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিড আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ পুনরায় চালু করতে বিশেষ জরুরি কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে।
দেশটিতে চলতি বছরের শুরু থেকেই জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত তেল আমদানি করা সম্ভব না হওয়ায় উৎপাদন ধাপে ধাপে কমতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ভেঙে পড়ে।
এই সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবায় তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর অনেক দেশ কিউবায় জ্বালানি রপ্তানির বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। এর ফলে বিদেশ থেকে তেল আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং আগে থেকেই চলমান জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব দেশের প্রায় সব খাতেই পড়েছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা অনেক এলাকায় অচল হয়ে পড়েছে। অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবাকেন্দ্র স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থাও অনেক স্থানে ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে হাজার হাজার জরুরি অস্ত্রোপচার স্থগিত রাখতে হয়েছে। অনেক চিকিৎসাসেবা সীমিত আকারে চালাতে হচ্ছে এবং বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। পানি উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বহু এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস সরবরাহও বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ রান্নাবান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
রাজধানী হাভানার ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা লিনা মে বলেন, তিনি তাঁর বাবাকে জানিয়েছেন যে এখন কাঠকয়লা কিনতেই হবে, কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থাও কঠিন হয়ে উঠছে। আরেক বাসিন্দা মারিও পেদ্রোসো বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে পর্যাপ্ত তেল আসছে না। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের সামনে কষ্ট সহ্য করা ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কিউবা নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। বাকি জ্বালানির জন্য দেশটিকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষে রাশিয়া থেকে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করা হলেও এপ্রিলের শেষ নাগাদ সেই মজুত শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার আগে থেকেই এলাকাভিত্তিক দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার নীতি অনুসরণ করছিল। অনেক এলাকায় টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ ছিল না। কিন্তু এবার জাতীয় গ্রিড সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এতে বিদ্যমান লোডশেডিং ব্যবস্থাও কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।
এটি চলতি বছরে কিউবার প্রথম বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয় নয়। এর আগে মার্চ ও মে মাসেও দেশটিতে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউট হয়েছিল। ধারাবাহিক এসব বিদ্যুৎ বিপর্যয় কিউবার জ্বালানি নিরাপত্তা, পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আবারও স্পষ্ট করেছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এখন কিউবা সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য