খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ৬:৪৭ পিএম

বাংলা সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান এবার নিজের দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি, সংগীতচর্চার অভিজ্ঞতা এবং একসময়ের ঢাকা শহরের সাংস্কৃতিক আবহকে তুলে ধরলেন আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’-এ। রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে মঙ্গলবার আয়োজিত প্রকাশনা উৎসবে বইটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের সংগীত ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি এবং কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপাসহ আরও অনেকে।
নিজের বহুল জনপ্রিয় গান ‘লোকে বলে প্রেম’-এর একটি চরণ থেকেই আত্মজীবনীর নাম নির্বাচন করেছেন ফেরদৌসী রহমান। বইয়ের শিরোনামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর কাছে প্রেম মানে সংগীতের প্রতি আজীবনের ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাকে ধরে রাখতে বছরের পর বছর যে সাধনা, পরিশ্রম, ত্যাগ এবং আত্মনিবেদন করতে হয়েছে, সেটিই তাঁর কাছে ‘জ্বালা’। শিল্পীর ভাষায়, এই ‘জ্বালা’ কোনো কষ্টের প্রতীক নয়; বরং সৃষ্টিশীল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বইটি সম্পর্কে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ফেরদৌসী রহমান বলেন, তিনি ব্যক্তিগত অর্জনের গল্পের চেয়ে মানুষের গল্প, সময়ের গল্প এবং সমাজের পরিবর্তনের কথাই বেশি তুলে ধরতে চেয়েছেন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার পরিবেশ, হারিয়ে যাওয়া সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খাবার, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাপনের নানা দিক বইটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাঁর বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম এই বইয়ের মাধ্যমে অতীতের এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রকাশনা উৎসবে দীর্ঘদিনের সহশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁদের পরিচয়। পরে ১৯৬৫ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার একসঙ্গে কণ্ঠ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তাঁর মতে, পল্লীগীতির কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের কন্যা হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন ফেরদৌসী রহমান, যা তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা অনুষ্ঠানে ফেরদৌসী রহমানকে বাংলা সংগীতের ‘হিমালয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আধুনিক গান, নজরুলসংগীত, পল্লীগীতি, ধ্রুপদী সংগীতসহ বিভিন্ন ধারার গানে সমান দক্ষতা দেখানো শিল্পী উপমহাদেশে খুবই বিরল। তাঁর বহুমাত্রিক সংগীতজীবন নতুন শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানের সূচনায় শিল্পী অনুপমা মুক্তি পরিবেশন করেন ফেরদৌসী রহমানের দুটি জনপ্রিয় গান—‘লোকে বলে প্রেম’ এবং ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’। গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ, যেখানে উপস্থিত অতিথিরা শিল্পীর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতিকে নতুন করে অনুভব করেন।
১৯৪১ সালের ২৮ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী রহমান। তাঁর সংগীতজীবনের হাতেখড়ি হয় বাবা, পল্লীগীতির কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন আহমদের কাছে। মাত্র ছয় বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালে, তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে তাঁর কণ্ঠে প্রথম গান প্রচারিত হয়। দেশভাগের পর পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন এবং এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রা।
১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে চলচ্চিত্র সংগীতে অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর ষাট ও সত্তরের দশকে প্রায় ২৫০টি চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়ে তিনি নিজেকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম দিনের সম্প্রচারেও গান পরিবেশন করেন তিনি, যা দেশের টেলিভিশন ইতিহাসেরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা গান পরিবেশন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি বাংলাদেশের সংগীতকে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’-এর মাধ্যমে অসংখ্য নতুন শিল্পীর কাছে তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রিয় শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। ১৯৭৭ সালে সেরা সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক পুরস্কার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং চুরুলিয়া নজরুল স্বর্ণপদকসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।
‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’ কেবল একজন শিল্পীর আত্মজীবনী নয়; এটি এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, সংগীতচর্চার অন্তরালের গল্প এবং হারিয়ে যেতে বসা পুরান ঢাকার জীবনধারার এক মূল্যবান দলিল। নিজের জীবন, সংগীতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষ্য এই বইয়ের মাধ্যমে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন বাংলা গানের এই কিংবদন্তি শিল্পী।
মন্তব্য