খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ (১২) গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে শিশুটির বাবা ইউনুস মিয়া কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি করেন। ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার সকালে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে মামলায় অভিযুক্তদের অধিকাংশই কাটাবিল এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি। গ্রেপ্তার হওয়া শ্রাবণ (২২) একই এলাকার বাসিন্দা। এজাহারে তাঁর নাম না থাকলেও গুলিবর্ষণের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগে তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তাঁকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে মূল অভিযুক্তদের বেশির ভাগই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের ধরতে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল একযোগে কাজ করছে।
গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী ইথানের বাবা ইউনুস মিয়া কুমিল্লা নগর উদ্যানের (শিশুপার্ক) একটি রাইড পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, তাঁর ছেলের পিঠ দিয়ে গুলি শরীরের ভেতরে প্রবেশ করেছে। কোনো অপরাধে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও একটি নিরীহ শিশুকে গুলিবিদ্ধ হতে হয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
ইথানের মা সোনিয়া আক্তারের অভিযোগ, কাটাবিল এলাকায় অপু ও সাব্বির নামের দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দিন ধরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন ছেলেকে নিয়মমতো স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। টিফিনের সময় খাবার কিনতে বাইরে বের হলে সংঘর্ষের মধ্যে তার পিঠে গুলি লাগে। একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কাটাবিল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। ঘটনার আগের রাতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
এরই ধারাবাহিকতায় পরদিন দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর একদল অস্ত্রধারী সেখানে হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় গুলিবর্ষণের ঘটনায় ইথান আহমেদসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন।
ইথান কাটাবিল রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, শিক্ষার্থীর পিঠে বিদ্ধ হওয়া গুলি তার ফুসফুসেও আঘাত করেছে। হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা খালি না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়, যাতে বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।
ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী আহত শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একজন স্কুলছাত্র যদি নিরাপদে স্কুলে যেতে না পারে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে সংসদ সদস্য বলেন, একটি শহরে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা, সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা চলতে পারে না। মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় পর্যায়েও উত্থাপনের কথা জানান।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাটাবিল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দূর করতে এলাকায় টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মন্তব্য