দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্যাজ সুরকার ও পিয়ানোবাদক আবদুল্লাহ ইব্রাহিম আর নেই। দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সংগীত ক্যারিয়ারে ৭০টিরও বেশি অ্যালবাম রেকর্ড করা এই গুণী সংগীতশিল্পী কিছুদিন অসুস্থতায় ভোগার পর জার্মানিতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। সোমবার (১৫ জুন) তার পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে বিশ্ববরেণ্য এই জ্যাজ তারকার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
Table of Contents
জীবনের প্রথমার্ধ ও সংগীত জীবনের সূচনা
আবদুল্লাহ ইব্রাহিম ১৯৩৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল ‘অ্যাডলফ জোহানেস ব্র্যান্ড’। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে তিনি নিজের মতো করে সুর করা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৫ বছর বয়সে একজন পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৫০-এর দশকে স্থানীয় জ্যাজ সংগীতের পরিমণ্ডলে তিনি ‘ডলার ব্র্যান্ড’ নামে ব্যাপক পরিচিতি ও সমাদৃত লাভ করেন।
১৯৬০ সালে তিনি ‘দ্য জ্যাজ এপিসেলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ঐতিহাসিক অ্যালবাম রেকর্ড করেন। তাদের প্রকাশিত ‘জ্যাজ এপিসেল ভার্স ওয়ান’ অ্যালবামটি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান সংগীতশিল্পীদের দ্বারা রেকর্ডকৃত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য জ্যাজ এলপি (LP)। যদিও তাদের এই সৃষ্টিগুলো সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা বহন করত না, তবুও তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকারের রোষানল থেকে তারা রেহাই পাননি।
নির্বাসন, আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম
বর্ণবাদী সরকারের নানামুখী চাপের কারণে ১৯৬০-এর দশকে আবদুল্লাহ ইব্রাহিম ইউরোপে পাড়ি জমান। ইউরোপে অবস্থানকালেই তিনি আমেরিকান জ্যাজ সংগীতের অন্যতম কিংবদন্তি ডিউক এলিংটনের নজরে পড়েন। ডিউক এলিংটন ইব্রাহিমের প্রতিভা অনুধাবন করে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে আমেরিকান জ্যাজ ছন্দের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে ইব্রাহিম ‘কেপ জ্যাজ’ নামক এক অনন্য নিজস্ব ধারা তৈরি করেন।
১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া তার বিখ্যাত ট্র্যাক ‘ম্যানেনবার্গ’ (Mannenberg) দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের চলমান বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রতীক ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তার মৃত্যুর পর তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ড. মেরিনা উমারি লিখেছেন, “দক্ষিণ আফ্রিকা এবং এর মানুষকে হৃদয়ে ধারণ করে আবদুল্লাহ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বিদায় নিয়েছেন। তিনি পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, দেশের প্রতি তার ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি।” আবদুল্লাহ ইব্রাহিম দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও কখনোই নিজের শিকড় ভুলে যাননি এবং সুযোগ পেলেই নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে এসে গান পরিবেশন করতেন। মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগেও তিনি কেপটাউন আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন, যা ছিল তার জীবনের শেষ লাইভ পারফরম্যান্স।
আবদুল্লাহ ইব্রাহিমের জীবন, প্রধান সৃষ্টি ও প্রাপ্ত পুরস্কারসমূহের একটি কাঠামোগত বিবরণ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
আবদুল্লাহ ইব্রাহিমের জীবন ও সংগীত ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
| বিষয়ের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| জন্মের নাম ও স্থান | অ্যাডলফ জোহানেস ব্র্যান্ড; কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা |
| জীবনাবসান | বয়স ৯১ বছর; জার্মানিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় |
| মোট রেকর্ডকৃত অ্যালবাম | ৭০টিরও বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যালবাম |
| ঐতিহাসিক কৃতিত্ব | ‘জ্যাজ এপিসেল ভার্স ওয়ান’ (কৃষ্ণাঙ্গদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য জ্যাজ এলপি) |
| বিখ্যাত রাজনৈতিক ট্র্যাক | ‘ম্যানেনবার্গ’ (১৯৭৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক) |
| সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর | ক্লেয়ার ডেনিস পরিচালিত ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ এবং ‘চকোলেট’ |
| উল্লেখযোগ্য অর্জন ও পুরস্কার | ‘জার্মান জাজ ট্রফি’ এবং দক্ষিণ আফ্রিকান মিউজিক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড |
চলচ্চিত্রে অবদান ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
জ্যাজ পিয়ানোবাদক ও সুরকার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি আবদুল্লাহ ইব্রাহিম চলচ্চিত্রের জগতেও নিজের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের (আবহ সংগীত) কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে বিশিষ্ট ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্লেয়ার ডেনিস পরিচালিত বিখ্যাত ড্রামা ফিল্ম ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ এবং ‘চকোলেট’-এর আবহ সংগীত পরিচালনা অন্যতম।
তার সাত দশকেরও বেশি দীর্ঘ গৌরবময় ক্যারিয়ারে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে অসংখ্য সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘জার্মান জাজ ট্রফি’ এবং স্বদেশের সর্বোচ্চ সংগীত সম্মাননা ‘দক্ষিণ আফ্রিকান মিউজিক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার প্রয়াণে বিশ্ব জ্যাজ সংগীতের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
