২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত আর্থিক কাঠামোতে দেশের ব্যাংক হিসাব ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অধিকাংশ নাগরিককে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর সনদ দাখিল করতে হবে। তবে এ নিয়ম সর্বজনীন নয়; শিক্ষার্থীসহ কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির হিসাবধারীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাধারণ নাগরিকদের জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বাধ্যতামূলক হলেও শিক্ষার্থী হিসাব, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সহজ শর্তে খোলা বিশেষ হিসাব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অব্যাহতি পাওয়া শ্রেণিগুলো এই বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকবে। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এই নীতিগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে একটি কেন্দ্রীয় তথ্য সমন্বয় ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং লেনদেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ সংস্থা এবং ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য একত্রিত করা হবে। ফলে একজন নাগরিকের আর্থিক ও সেবাভিত্তিক কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামোতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণের জন্য দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঘাটতি অর্থায়নের কাঠামো নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—
| অর্থায়নের উৎস | পরিমাণ (কোটি টাকা) |
|---|---|
| বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান | ১,১৬,০০০ |
| অভ্যন্তরীণ উৎস | ১,২৭,০০০ |
| ├ ব্যাংক ব্যবস্থা | ১,১২,০০০ |
| └ সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য | ১৫,০০০ |
সারণি থেকে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বড় অংশই আসবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে, যা মোট অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকেও তুলনামূলকভাবে ছোট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত আর্থিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে। সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসারে বাজেট উপস্থাপনের আগে এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাবে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মতি গ্রহণের পর তা কার্যকর হবে। নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১ জুলাই থেকে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বাধ্যতামূলক করার ফলে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর ব্যবস্থার আওতা আরও বিস্তৃত হবে। তবে সাধারণ মানুষের একটি অংশের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, এই প্রস্তাবিত নীতি পরিবর্তন দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত, নিয়ন্ত্রিত এবং স্বচ্ছ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
