নূর জাহানের মৃত্যু নিয়ে বিতর্কে নতুন তথ্য

মিরপুরের একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগের মধ্যে তার সন্তানদের অবহেলার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। তবে ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে, যা প্রাথমিকভাবে প্রচারিত কিছু দাবির সঙ্গে ভিন্নতা দেখায়।

গত ৩১ মে রাজধানীর মিরপুরের সেকশন-৬, ব্লক-সি, ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটির মালিক তার মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, জীবনের শেষ দুই বছর তিনি মেয়ের সঙ্গেই ওই বাসায় বসবাস করছিলেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি দুই ছেলের বাসায়ও অবস্থান করেছেন।

মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ফ্ল্যাটের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং মরদেহের কিছু দৃশ্য নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয় কিছু ব্যক্তির দাবি ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, মরদেহ উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে নূর জাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরেছিল।

তবে ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মরদেহ মর্গে আনার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কোনো এক সময়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে মৃত্যুর বহুদিন পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে—এমন দাবি সমর্থন করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আরও জানা গেছে, মরদেহের পিঠে যে ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে, সেটিকে অনেকেই পচনের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘বেডসোর’ বা ‘শয্যাক্ষত’। দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে শুয়ে বা বসে থাকলে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের শরীরে এ ধরনের ক্ষত তৈরি হতে পারে। এতে ফোসকা, ঘা বা পচনের মতো উপসর্গ দেখা দিলেও তা মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার প্রমাণ নয়।

ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিষয়প্রাপ্ত তথ্য
মৃত ব্যক্তির নামনূর জাহান বেগম
বয়স৭৫ বছর
মরদেহ উদ্ধারের তারিখ৩১ মে
স্থানমিরপুর, সেকশন-৬, ব্লক-সি, ১৩ নম্বর সড়ক
শেষ দুই বছরের আবাসমেয়ের ফ্ল্যাট
ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যমৃত্যুর সম্ভাব্য সময় মর্গে আনার আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
শরীরের ক্ষতশয্যাক্ষত (বেডসোর) হিসেবে বর্ণনা
দাফনের স্থানচাঁদপুরের উত্তর উপজেলার গ্রামের বাড়ি

পরিবারের সদস্যদের দাবি অনুযায়ী, মৃত্যুর দিনই পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরদিন চাঁদপুর জেলার উত্তর উপজেলার গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। দাফন কার্যক্রমে তার বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, মৃত্যুর দুই দিন আগে ঈদের দিনে ছোট ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে সন্তানরা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন বা তার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করেননি।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর জেরে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী নূর জাহান বেগমের সন্তানদের আইনি নোটিশ পাঠান। একই সময়ে তার বড় ছেলে ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমানকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

নূর জাহান বেগমের মৃত্যু নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী অনুসন্ধানের তথ্য মিলিয়ে ঘটনাটি এখনো জনআলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সময়, শারীরিক অবস্থার কারণ এবং পারিবারিক অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে প্রচারিত কিছু দাবির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের পার্থক্য পাওয়া গেছে।