দিনভর ব্যাপক বিক্ষোভ ও উত্তেজনার কারণে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের পূর্বনির্ধারিত সভাটি দুপুরে স্থগিত করা হলেও সোমবার রাতে তা অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খুরশিদ আলমের সভাপতিত্বে এই অনলাইন সভাটি সফলভাবে পরিচালিত হয়। ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনের বিরোধিতা করে ব্যাংকের গ্রাহক পরিচয় দেওয়া একদল বিক্ষোভকারীর দিনব্যাপী আন্দোলনের মুখে সোমবার দুপুরে দিলকুশায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয়ে এই সভাটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
ব্যাংক সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ এই নৈশকালীন অনলাইন সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পর্ষদটি ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুকের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে, যিনি ইতিপূর্বে বাধ্যতামূলক ছুটিতে অবস্থান করছিলেন। তবে সভায় অন্য কী কী বিষয়ে আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে যে, কোনো ধরনের বিক্ষোভ বা আন্দোলনের মুখে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানকে অপসারণ করার কোনো সুযোগ নেই এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি সিদ্ধান্ত কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
প্রধান কার্যালয়ের সামনে সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
সোমবার সকাল থেকেই দেশের বৃহত্তম শরিয়াহ-ভিত্তিক এই বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একদল মানুষ সেখানে সমবেত হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন উক্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। আন্দোলনকারীরা রাস্তা অবরোধ করে নির্ধারিত পর্ষদ সভা পণ্ড করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের এই নির্দেশনা অমান্য করলে পুলিশ জলকামান ও শব্দবোমা ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে, যার ফলে পুরো মতিঝিল এলাকায় এক বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এই সংঘাতের ঘটনায় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হন এবং তাদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রধান কার্যালয়ের বাইরের এই চরম বিশৃঙ্খলা বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অনলাইনের মাধ্যমে পর্ষদ সভা আয়োজনের বিশেষ অনুমতি প্রদান করে। এদিকে অনলাইনের মাধ্যমে পর্ষদ সভা আয়োজনের খবর প্রকাশ হওয়ার পর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে কিছু বিক্ষোভকারী আচমকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তারা ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনের কক্ষে ঢুকে পড়ে, যেখানে তিনি ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করছিলেন। পুলিশের মতিঝিল জোনের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান যে, তারা শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সারাদিন সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিয়মিত কর্তব্যের অংশ হিসেবেই ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে অবস্থান করছিলেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, নতুন চেয়ারম্যানের এই নিয়োগটি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে করা হয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলাকে পুনরায় বিঘ্নিত করতে পারে। এই ঘটনার পর ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয় এবং বিকেল পৌনে ছয়টার দিকে বিক্ষোভকারীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে স্থান ত্যাগ করে।
ঘটনা ও বিক্ষোভ কর্মসূচির বিবরণী
ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং বিক্ষোভকারীদের পরবর্তী কর্মসূচি নিচে তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | ঘটনার বিবরণ ও কর্মসূচি | সুনির্দিষ্ট সময়কাল | বর্তমান অবস্থা ও স্থান |
| ১ | প্রধান কার্যালয়ের সভা স্থগিত | সোমবার দুপুর | বিক্ষোভকারীদের রাস্তা অবরোধ ও স্লোগানের কারণে স্থগিত করা হয়। |
| ২ | অনলাইন পর্ষদ সভা সম্পন্ন | সোমবার রাত | নতুন চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে সব সদস্যের উপস্থিতিতে সম্পন্ন। |
| ৩ | পদত্যাগপত্র গ্রহণ | পর্ষদ সভা চলাকালীন | বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগ অনুমোদন। |
| ৪ | প্রধান কার্যালয়ে মানববন্ধন | মঙ্গলবার (সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা) | টানা সাত ঘণ্টা প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি। |
| ৫ | শাখা পর্যায়ের বিক্ষোভ | মঙ্গলবার (সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা) | দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ব্যাংকের শাখাগুলোতে বিক্ষোভ প্রদর্শন। |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি অবস্থান ও রাজনৈতিক দলের বক্তব্য
সদ্য সমাপ্ত ঈদুল আজহার ছুটির আগের শেষ কার্যদিবসে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংক মোহাম্মদ খুরশিদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আবেগ, রাজনৈতিক চাপ বা আন্দোলনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ও দেশের প্রচলিত আইনি বিধান অনুসরণ করে কাজ করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের অবস্থান এই বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের কার্যক্রমে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। মুখপাত্র বলেন, আজ যদি কোনো আন্দোলনের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে, তবে ভবিষ্যতে অন্য কোনো পক্ষ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব বিধিমালা অনুযায়ী চলবে এবং আন্দোলনের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
এদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সোমবার এক বিবৃতিতে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন যে, ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনকালে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর এই বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে অনেক গ্রাহক আহত হয়েছেন। অপরদিকে, জাতীয়তাবাদী ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (জেবিএবি) রাজধানীর মতিঝিলে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ইসলামী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ ওমর ফারুকের ওপর একদল অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির শারীরিক লাঞ্ছনা ও হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং এই ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে।
