দেশে বর্তমানে হামের সংক্রমণ পুরোনো বি৩ ধরন (ভেরিয়েন্ট) থেকেই ঘটছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় পরীক্ষাগারের গবেষকেরা। জিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন যে ভাইরাসটি বাইরে থেকে আসেনি এবং দীর্ঘদিন ধরেই দেশে সক্রিয় রয়েছে।
সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পোলিও, হাম ও রুবেলা পরীক্ষাগার এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—উভয় জায়গাতেই হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করা হয়। দুই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফল একই পাওয়া গেছে, যেখানে দেখা গেছে সংক্রমণকারী ধরনটি বি৩।
Table of Contents
জিন বিশ্লেষণের ফলাফল
ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে ৩৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ২০২৬ সালের মে মাসে আরও ৩৮টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। সব ক্ষেত্রেই বি৩ ধরন শনাক্ত হয়েছে।
নিচে পরীক্ষাগারভিত্তিক ফলাফল উপস্থাপন করা হলো—
| প্রতিষ্ঠান | সময়কাল | নমুনা সংখ্যা | ফলাফল |
|---|---|---|---|
| জাতীয় পোলিও, হাম ও রুবেলা পরীক্ষাগার | ডিসেম্বর ২০২৫ – ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৫টি | বি৩ ধরন শনাক্ত |
| রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান | মে ২০২৬ | ৩৮টি | বি৩ ধরন শনাক্ত |
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখন পর্যন্ত হামের মোট ২৪টি জিনগত ধরন শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে প্রধানত বি৩ ধরনই সক্রিয় রয়েছে, যদিও অতীতে অন্য ধরনও পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুবা জামিল আমাদের প্রতিনিধি কে বলেন, ‘২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ৩৫টি নমুনার হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করে বি৩ ধরন জানতে পেরেছি।’
তিনি আরও জানান, এই পরীক্ষাগার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত এবং নিয়মিতভাবে জিন বিশ্লেষণের তথ্য সংস্থাটিতে পাঠানো হয়। একইভাবে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মে মাসের ৩৮টি নমুনার বিশ্লেষণেও একই ফল পাওয়া গেছে।
সংক্রমণের ইতিহাস ও ধরন পরিবর্তন
গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৪ সালে প্রথম বি৩ ধরন শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭–২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় ডি৮ ধরন শনাক্ত হয়েছিল। তবে এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বি৩ ধরনই প্রধান হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পাওয়া বি৩ ধরনই দেশে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং নতুন কোনো বিদেশি প্রবেশের প্রমাণ মেলেনি।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট উপসর্গজনিত মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৫১১ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯০ জনের।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| উপসর্গজনিত মৃত্যু | ৫১১ জন |
| নিশ্চিত হামে মৃত্যু | ৯০ জন |
| মোট মৃত্যু | ৬০০-এর বেশি |
| পাঁচ বছরের নিচে মৃত্যুর হার | প্রায় ৮০% |
হামের সংক্রমণ শুরু হয় ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকে এবং এরপর থেকে মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের বক্তব্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, ‘সারা দেশে টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ কমে এসেছে। সংক্রমণ কমার কারণে মৃত্যুও কমে আসবে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, দেশে এই সময় শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাতে মৃত্যুও হয়। তাই সব মৃত্যু যে হামে হচ্ছে, তা নয়।’
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও প্রতিক্রিয়া
হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, কান সংক্রমণ, চোখের সমস্যা এবং নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। নিউমোনিয়া জটিল হলে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালে অতিরিক্ত ভেন্টিলেটর সরবরাহ, পৃথক ওয়ার্ড স্থাপন এবং কিছু হাসপাতালকে নির্দিষ্টভাবে হামের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করেছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি।
জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘যা ঘটেছে, যা ঘটছে, তা খুবই দুঃখজনক। হামের একটা মহামারি হলো, অথচ আমরা তা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করতে পারলাম না। এই ঘটনা সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা পায়নি। এটা মেনে নেওয়া কঠিন।’
