থানাকাণ্ডে উত্তাল রংপুর, তদন্তে তিন সদস্য

রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটিকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর রংপুর মহানগর পুলিশ (আরএমপি) তাৎক্ষণিকভাবে তিন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করেছে এবং অভিযোগ তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। তবে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অভিযোগের শিকার রাকিবুল ইসলাম সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। তাঁর দাবি, বুধবার রাতে একটি সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা করতে তিনি কোতোয়ালি থানায় যান। সেখানে উপস্থিত অবস্থায় থানার ওসি ও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নেতৃত্বে তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। মারধরের ফলে তাঁর মাথা, চোখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার আগে নগরীর সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাদের পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিল। পরবর্তীতে ওই যুগলকে উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় উপস্থিত হন। রাকিবুল ইসলামও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।

রাকিবুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি থানার ভেতরে এক পুলিশ সদস্যকে ওই যুগলকে মারধর করতে দেখেন। তিনি এ বিষয়ে আপত্তি জানালে পুলিশ সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর ওপর চড়াও হন। তিনি দাবি করেন, তাঁকে কিল-ঘুষি মারার পাশাপাশি রাইফেলের বাট দিয়েও আঘাত করা হয়। এছাড়া তাঁর সঙ্গে থাকা দুটি মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কোতোয়ালি থানার সামনে জড়ো হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে থানার প্রধান ফটক ও কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় আহত রাকিবুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার বর্ণনা দেন এবং বিচার দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয় জানানোর পরও তাঁকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, থানার ওসি আজাদ রহমান অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনার সময় থানার ভেতরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাইরে হট্টগোল ও হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং রাকিবুল ইসলাম অন্য কোনো সংঘর্ষে আহত হয়ে থাকতে পারেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

ঘটনার পর গভীর রাতে রংপুর মহানগর পুলিশ একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, প্রাথমিক তদন্তের স্বার্থে উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা এবং কনস্টেবল লিমা সরেনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমার নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিষয়তথ্য
ঘটনার স্থানকোতোয়ালি থানা, রংপুর
ঘটনার সময়বুধবার রাত
অভিযোগকারীরাকিবুল ইসলাম
পরিচয়সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব
অভিযোগথানার ভেতরে মারধর ও নির্যাতন
আহতের অবস্থারংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্য৩ জন
তদন্ত কমিটির প্রধাননরেশ চাকমা
ওসির অবস্থানঅভিযোগ অস্বীকার

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাকারিয়া ইসলাম বলেছেন, সংগঠনের এক নেতাকে থানার ভেতরে নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি ওসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

এদিকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট তিন সদস্যকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ওসির বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট যে-ই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ সবসময়ই জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করে। ফলে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এখন সংশ্লিষ্ট মহল, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের নজর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। সেই প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করবে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ।