পাবনা সদর উপজেলায় এক নবম শ্রেণীর স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা এবং পরবর্তীতে মরদেহ বস্তাবন্দী করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার রাতে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশ তদন্ত পরিচালনা করে মূল অভিযুক্তসহ তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। আজ বুধবার (৩ জুন) বিকেলে পাবনা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর রহমান।
Table of Contents
অপরাধের বিবরণ ও তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি
পুলিশের তদন্ত ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, নিহত নবম শ্রেণীর ওই কিশোরী ছাত্রীর বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা এলাকায়। তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই নাইমের। গত মঙ্গলবার রাতে নাইমের নিজস্ব আবাসিক বাসায় ওই কিশোরীর সঙ্গে কোনো একটি বিষয়ে তীব্র কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা হয়। এই বিরোধের একপর্যায়ে নাইম ওই কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করার পর অপরাধের আলামত গোপন করার উদ্দেশ্যে নাইম তার সহযোগীদের ডেকে নেয়। সহযোগীদের সহায়তায় নিহত কিশোরীর হাত-পা শক্ত করে বেঁধে এবং গলায় বাজারের ব্যাগ পেঁচিয়ে মরদেহটি একটি বস্তার ভেতর বন্দি করা হয়। এরপর একটি ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেটকার) ব্যবহার করে মরদেহটি পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের অন্তর্গত পদ্মা নদীতে নিয়ে ফেলা হয়।
প্রযুক্তিগত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে জানান, আজ বুধবার সকালে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরীর বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধারের পরপরই পাবনা জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট একযোগে তদন্তে নামে। ঘটনাস্থল এবং এর আশেপাশের এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ এবং আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট সহায়তার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য ও মোটিভ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়।
মামলার বর্তমান অগ্রগতি: সংবাদ সম্মেলনের সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উল্লেখ করেন যে, এই প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত এজাহার জমা দেওয়ার সাথে সাথেই সেটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
অভিযুক্তদের আটক ও আলামত জব্দকরণ
পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধান অভিযুক্তসহ মোট তিনজনকে আটক করেছে। আটককৃত ব্যক্তিরা হলেন—
নাইম: হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত, পাবনা সদর উপজেলার পূর্ব রাঘবপুর এলাকার কাশেম উদ্দিনের ছেলে।
ইয়াসিন শেখ: একই এলাকার শফিক শেখের ছেলে।
তুহিন প্রামাণিক: একই এলাকার শিমুল প্রামাণিকের ছেলে।
অপরাধ সংঘটনের পর মরদেহ পরিবহনে এবং তা নদীতে ফেলার কাজে ব্যবহৃত হওয়া প্রাইভেটকারটিও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক জব্দ করা হয়েছে। এই নৃশংস ঘটনার পেছনে আরও কোনো ব্যক্তি বা তথ্য জড়িত আছে কি না, তা পরবর্তী নিবিড় তদন্ত কার্যক্রমের পর বিস্তারিতভাবে জানানো হবে বলে পুলিশ প্রশাসন থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মাধ্যমে মরদেহ উদ্ধার ও উদ্ধারকালীন অবস্থা
এর আগে, আজ বুধবার সকালের দিকে পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের পিরপুর এলাকার পদ্মার চরে স্থানীয় কৃষকেরা যখন দৈনন্দিন কৃষি কাজ করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, তখন তারা নদীর তীরে নোঙর করে রাখা একটি নৌকার পাশে একটি সন্দেহভাজন বস্তা ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান। স্থানীয় বাসিন্দারা কৌতুহলী হয়ে বস্তাটি টেনে খুলে ভেতরে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান এবং তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেন।
খবর পেয়ে পাবনা সদর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নদী থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করে। সুরতহাল রিপোর্টের সময় পুলিশ দেখতে পায় যে, নিহত কিশোরীর হাত দুটি বাঁধা ছিল এবং তার গলায় একটি বাজারের ব্যাগ পেঁচানো অবস্থায় ছিল। পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
