ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে এক ইসরাইলি নারী পর্যটককে গণধর্ষণ এবং এক স্থানীয় যুবককে হত্যার দায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজ্যের একটি জেলা ও দায়রা আদালত বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে গণধর্ষণের অপরাধে দোষীদের ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত’ কারাদণ্ড ভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা কার্যত আমৃত্যু কারাবাসের শামিল।
ঘটনার পটভূমি
চলতি বছরের মার্চ মাসে কোপ্পাল জেলার একটি প্রত্যন্ত এলাকায় এ নৃশংস ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন মোট পাঁচজন পর্যটক হামলার শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—মহারাষ্ট্র ও ওড়িশা থেকে আসা দুই ভারতীয় নাগরিক, একজন মার্কিন পর্যটক, একজন ইসরাইলি নারী পর্যটক এবং কোপ্পালের একটি হোমস্টের মালিক। হোমস্টের মালিক অতিথিদের নিয়ে নিকটবর্তী একটি দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন।
পথিমধ্যে মোটরসাইকেলে করে তিন অভিযুক্ত—মল্লেশ (হান্দিমল্লা), সাইকুমার ও শরনবাসভারাজ—পর্যটক দলের সামনে এসে কথিত ‘আর্থিক বিরোধ’ মীমাংসার দাবি তোলে। প্রথমে বাকবিতণ্ডা, পরে তা সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা দলের তিন পুরুষ সদস্যকে পাশের একটি খালে ঠেলে ফেলে দেয় এবং দুই নারীকে জোরপূর্বক নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করে। খাল থেকে উঠতে না দিতে পুরুষদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এতে একজন স্থানীয় যুবক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, মার্কিন পর্যটকের সহায়তায় একজন প্রাণে বাঁচলেও অপরজন পানিতে ডুবে মারা যান।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়
মামলায় গণধর্ষণ, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়। আদালতে উপস্থাপিত ফরেনসিক প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি এবং মোবাইল ফোনের লোকেশন তথ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত তিনজনকেই দোষী সাব্যস্ত করেন। বিচারক সাদানন্দ নাগাপ্পা নাইক ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩ ধারায় হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পাশাপাশি গণধর্ষণের অপরাধে পৃথকভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
নিম্নে মামলার প্রধান অভিযোগ ও শাস্তির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—
| অভিযোগ | প্রমাণিত অপরাধ | আদালতের রায় |
|---|---|---|
| হত্যা | স্থানীয় যুবকের মৃত্যু | মৃত্যুদণ্ড |
| গণধর্ষণ | দুই নারী ভুক্তভোগী | আমৃত্যু কারাদণ্ড |
| হত্যাচেষ্টা | দুই পুরুষ পর্যটক | দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড |
| ডাকাতি ও চাঁদাবাজি | অর্থ আদায়ের চেষ্টা | কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড |
জনমত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
রায়কে অনেকেই দৃষ্টান্তমূলক বলে অভিহিত করেছেন। মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নারীর সুরক্ষায় কঠোর বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হওয়া বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কর্ণাটক রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, পুলিশি টহল বৃদ্ধি এবং হোমস্টে নিবন্ধন ও নজরদারি কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কেবল কঠোর শাস্তিই যথেষ্ট নয়; সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন—এই তিনটি দিক সমন্বিতভাবে কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংস অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
