সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশ ফুটবল দল

দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার লক্ষ্যে আরও একটি বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। ভারতের গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেমিফাইনাল ম্যাচে নেপালকে ২–১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করেছে বাংলাদেশ। এই গুরুত্বপূর্ণ জয়ের মাধ্যমে দল টানা তৃতীয়বারের মতো এই মর্যাদাপূর্ণ আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল। ম্যাচের শুরুর দিকে বাংলাদেশ দলের কৌশল ও মাঠের পারফরম্যান্স কিছুটা অগোছালো ছিল, যার ফলে শুরুতেই গোল হজম করে পিছিয়ে পড়তে হয়। এই পরিস্থিতি ডাগআউটে থাকা প্রধান কোচ পিটার বাটলারের জন্য বেশ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে প্রাথমিক সেই ধাক্কা সামলে নিয়ে পরবর্তী সময়ে দুর্দান্ত এক দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

প্রথমার্ধের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নেপালের লিড

খেলার প্রারম্ভিক মুহূর্ত থেকেই নেপাল নারী ফুটবল দল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে। মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং একের পর এক পরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের রক্ষণভাগের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। নেপালের এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফল আসে ম্যাচের ২৩তম মিনিটে। দলের খেলোয়াড় দীপা শাহির নিখুঁতভাবে নেওয়া একটি কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলকে চমৎকার পায়ের টোকায় বাংলাদেশের জালে জড়িয়ে দেন গীতা রানা। এই প্রথম গোলটি হজম করার পর বাংলাদেশ দল স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা মানসিক ও কৌশলগত চাপের মধ্যে পড়ে যায়। ফলস্বরূপ, প্রথমার্ধের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশকে তাদের নিজেদের গোলপোস্ট রক্ষার্থেই ব্যস্ত সময় পার করতে হয়।

ঋতুপর্ণার অলিম্পিক গোল ও সমতা নির্ধারণ

প্রথম অর্ধে খেলার গতিপ্রকৃতি নেপালের অনুকূলে থাকলেও বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ম্যাচে সমতা ফেরে। প্রথমার্ধের নির্ধারিত সময় শেষে রেফারি কর্তৃক প্রদত্ত যোগ করা সময়ে (ইনজুরি টাইম) বাংলাদেশ একটি কর্নার কিক লাভ করে। দলের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমার নেওয়া সেই শটটি কোনো খেলোয়াড়ের স্পর্শ ছাড়াই সরাসরি বাঁক খেয়ে নেপালের গোলপোস্টের ভেতরে চলে যায়। ফুটবলীয় পরিভাষায় সরাসরি কর্নার থেকে হওয়া এমন গোলকে ‘অলিম্পিক গোল’ বলা হয়। ঋতুপর্ণার এই অবিশ্বাস্য ও চোখধাঁধানো গোলটি পুরো ম্যাচের দৃশ্যপট ও মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ বদলে দেয়। এর ফলে ১–১ গোলের সমতা নিয়েই দুই দল প্রথমার্ধের বিরতিতে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধের উত্তেজনা ও গোলকিপার মিলির প্রতিরোধ

দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার পর নেপাল পুনরায় তাদের আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেয় এবং বাংলাদেশকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য করে। নেপালের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক আক্রমণের মুখে তাদের ফরোয়ার্ড রেখা বাংলাদেশের গোলকিপারকে কাটিয়ে ফাঁকা পোস্টে শট নিয়েছিলেন। তবে বলটি গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে বাংলাদেশ দল এক নিশ্চিত গোলের হাত থেকে অত্যন্ত অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়।

ম্যাচের আধিপত্য বজায় রাখতে এরপর উভয় দলই বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট আক্রমণ ও পাল্টা-আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে। খেলার ৬৯তম মিনিটে নেপালের সারু লিম্বুর নেওয়া একটি দূরপাল্লার বাঁকানো শট গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। এই পুরো সময়টাতে বাংলাদেশের গোলকিপার মিলি পোস্টের নিচে অত্যন্ত দূরদর্শিতা ও দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি নেপালের বেশ কয়েকটি নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা চমৎকারভাবে প্রতিহত বা সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সাগরিকার সুযোগ এবং ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ

ম্যাচের ৭৮তম মিনিটে বাংলাদেশের সামনে লিড নেওয়ার বা এগিয়ে যাওয়ার একটি অত্যন্ত সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। মাঠের মধ্যভাগ থেকে সতীর্থ শামসুন্নাহার জুনিয়রের বাড়িয়ে দেওয়া একটি নিখুঁত পাস নিয়ন্ত্রণে নেন ফরোয়ার্ড সাগরিকা। তিনি নেপালের গোলপোস্টের খুব কাছাকাছি অবস্থান থেকে শট নিলেও নেপালের গোলকিপার অত্যন্ত তৎপরতার সাথে এক চমৎকার পাঞ্চ বা ঘুষির সাহায্যে বলটি ক্লিয়ার করেন। এই সুযোগটি হাতছাড়া হওয়ার পর মাঠের পরিস্থিতি আরও বেশি ঘনীভূত ও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে, যার ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে এক তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা ও সাগরিকার জয়সূচক গোল

ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষেও স্কোরলাইন ১–১ সমতায় অবরুদ্ধ ছিল। এরপর রেফারি খেলা পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত আরও ৬ মিনিট সময় নির্ধারণ করেন। এই যোগ করা সময়ের মধ্যেই ম্যাচের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে। খেলার একেবারে শেষ দিকে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের মাঝে একটি দুর্দান্ত এবং নিখুঁত সমন্বিত আক্রমণ সংগঠিত হয়। সেই আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় দারুণ এক শটের মাধ্যমে নেপালের জাল কাঁপান সাগরিকা। এই জয়সূচক গোলের সাথে সাথেই বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার পথ নিশ্চিত হয়ে যায়।

চূড়ান্ত বাঁশি বাজার পর ২–১ গোলের এই রোমাঞ্চকর ও ঐতিহাসিক জয়ে নেপালকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে ফাইনালে পা রাখে বাংলাদেশ। এই জয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ধরে রাখার আরও একধাপ কাছাকাছি পৌঁছে গেল বাংলাদেশের মেয়েরা।