বেতন বৃদ্ধি ও অস্ট্রেলিয়ায় অতিরিক্ত করের আর্থিক ঝুঁকি

অস্ট্রেলিয়ায় কর্মসংস্থান ও পেশাগত ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে গত ১২ মাসে যে সমস্ত চাকরিজীবী বেতন বৃদ্ধির সুবিধা লাভ করেছেন, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে নতুন ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান ও তথ্যানুযায়ী, এই সময়সীমার মধ্যে বেতন বৃদ্ধি পাওয়া চাকরিজীবীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মেডিকেয়ার লেভি সারচার্জ বা এমএলএস (MLS)-এর জন্য সরকারের নির্ধারিত আয়ের সীমা অতিক্রম করেছেন। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব হিসেবে, অতিরিক্ত করের বোঝা এড়াতে আগামী ১ জুলাই নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পূর্বেই তাদের জন্য উপযুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল বীমা বা প্রাইভেট হসপিটাল ইন্স্যুরেন্স গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলীয় কর ব্যবস্থার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সিঙ্গেল বা অবিবাহিত ব্যক্তিদের জন্য এই আয়ের বিশেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭২,৭২১ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১০১,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সমতুল্য। অন্যদিকে, দম্পতি ও পরিবারের ক্ষেত্রে এই আয়ের সীমার পরিমাণ হচ্ছে ১৪৫,৪৪১ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ২০২,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এই নির্দিষ্ট আয়ের কোটা পার হওয়ার সাথে সাথেই করদাতাদের ওপর নতুন এই নিয়মটি কার্যকর হতে শুরু করে।

অতিরিক্ত করের আর্থিক বোঝা ও আইনি নিয়মনীতি

মানি ডট কম ডট এইউ (Money.com.au) নামক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার এই কর সংক্রান্ত জটিলতার চিত্রটি সুনির্দিষ্টভাবে উঠে এসেছে। গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, যে সমস্ত করদাতা বা চাকরিজীবী সরকারের নির্ধারিত এই আয়ের সীমা অতিক্রম করেছেন, কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থবছরের জন্য কোনো উপযুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল বীমার আওতাভুক্ত ছিলেন না, তাদের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশের ওপর অতিরিক্ত ১% থেকে শুরু করে ১.৫% পর্যন্ত অতিরিক্ত কর বা সারচার্জ আরোপিত হতে পারে। এই বিশেষ সারচার্জটি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ ২% মেডিকেয়ার লেভির অতিরিক্ত একটি কর হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করা হবে।

আর্থিক পরিমাপের ক্ষেত্রে, অবিবাহিত বা সিঙ্গেল ব্যক্তিদের জন্য এই সারচার্জের সর্বনিম্ন পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৭২৭ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১,০১০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। একইভাবে, দম্পতি বা পরিবারের জন্য এই ন্যূনতম সারচার্জের পরিমাণ হচ্ছে ১,৪৫৪ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ২,০২০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এই অতিরিক্ত করের আওতা থেকে আইনিভাবে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য গ্রাহকদের অবশ্যই একটি সরকারের নিবন্ধিত স্বাস্থ্য তহবিলের অধীনে সম্পূর্ণ অর্থবছরের জন্য উপযুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল বীমা বা পলিসি সচল রাখতে হবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কেবল অতিরিক্ত সেবা বা এক্সট্রাস-অনলি (Extras-only) এবং কেবল অ্যাম্বুলেন্স সেবা বা অ্যাম্বুলেন্স-অনলি (Ambulance-only) সংক্রান্ত স্বাস্থ্য পলিসিগুলো এই সারচার্জ বা অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতির জন্য কোনোভাবেই যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

নীতি নির্ধারণ ও বাজার যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় পরামর্শ

মানি ডট কম ডট এইউ-এর স্বাস্থ্য বীমা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক ক্রিস হোয়াইটল সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে করদাতাদের উদ্দেশ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেছেন। তিনি জানান, যেসব চাকরিজীবীর বার্ষিক আয় সম্প্রতি এই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে, তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজস্ব বেসরকারি হাসপাতাল বীমার বার্ষিক ব্যয় এবং সম্ভাব্য সারচার্জের আর্থিক পরিমাণের মধ্যে একটি তুলনামূলক মূল্যায়ন করা আবশ্যক।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, অবিবাহিত ব্যক্তিদের জন্য বাজারে বিদ্যমান কিছু মৌলিক বা বেসিক হাসপাতাল বীমা পলিসির বার্ষিক খরচ প্রায় ৭২০ মার্কিন ডলার থেকে শুরু হয়, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এই খরচটি বীমাহীন উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য সম্ভাব্য সারচার্জ বা অতিরিক্ত করের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। তবে ক্রিস হোয়াইটল একই সাথে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিক বা এন্ট্রি-লেভেলের এই পলিসিগুলোতে স্বাস্থ্য সুবিধার পরিমাণ এবং পরিধি বেশ সীমিত থাকে। ফলস্বরূপ, দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে ভোক্তারা ডেন্টাল বা দাঁতের চিকিৎসা, অপটিক্যাল বা চোখের চিকিৎসা এবং ফিজিওথেরাপি সেমার মতো বিস্তৃত এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা সম্বলিত উন্নত পলিসিগুলো বেছে নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে পারেন।

ভবিষ্যৎ সীমার পরিবর্তন ও প্রজন্মের ভিত্তিতে প্রভাবের তারতম্য

অস্ট্রেলিয়ার কর প্রশাসন আগামী নতুন অর্থবছর থেকে এই নিয়মে কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এই মেডিকেয়ার লেভি সারচার্জের (এমএলএস) আয়ের সর্বনিম্ন সীমা আরও কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছে। এই নতুন ও সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, অবিবাহিত বা সিঙ্গেল ব্যক্তিদের জন্য আয়ের এই সীমা বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫,৬০১ মার্কিন ডলার বা ১০৫,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। একইভাবে দম্পতি ও পারিবারিক করদাতাদের জন্য এই নতুন সীমার পরিমাণ হবে ১৫১,২০১ মার্কিন ডলার বা ২১০,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।

পরিচালিত গবেষণায় আরও একটি সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে দেখা গেছে যে আয়ের সীমা অতিক্রমের এই প্রবণতায় তরুণ প্রজন্মের অস্ট্রেলিয়ানরা সবচেয়ে বেশি হারে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিগত এক বছরে কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির কারণে ‘মিলেনিয়াল’ প্রজন্মের প্রায় ৪৯% এবং ‘জেন জি’ প্রজন্মের ৩৯% উত্তরদাতা এই আয়ের সীমার ওপরে চলে গেছেন এবং করের ঝুঁকিতে পড়েছেন। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, তুলনামূলক প্রবীণদের মধ্যে ‘জেন এক্স’ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৭% এবং ‘বেবি বুমার্স’ প্রজন্মের মাত্র ৭% ব্যক্তি এই আয়ের উর্ধ্বমুখী সীমা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।