দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আরও ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ ছিল, ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের এই ঋণ ও অগ্রিম সংক্রান্ত সার্বিক আর্থিক চিত্র এবং শ্রেণিকৃত ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা প্রকাশ করা হয়েছে।
Table of Contents
মোট ঋণ ও খেলাপি ঋণের সামগ্রিক পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের বিতরণকৃত মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। বিতরণকৃত এই বিশাল অঙ্কের ঋণের মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অথচ এর আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ফলে হিসাব অনুযায়ী মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
খেলাপি ঋণের হারের তুলনামূলক চিত্র
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের ব্যবধানে দেশে খেলাপি ঋণের সামগ্রিক হার ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে অর্থাৎ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চে এসে সেই খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে। তিন মাসের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণের হারের এই বৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরিস্থিতি নির্দেশ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য: খেলাপি ঋণের এই ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার হার দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
ব্যাংকভিত্তিক খেলাপি ঋণের বিস্তারিত বিবরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে বর্তমান খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা, যা এই ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
অন্য দিকে, দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণের অঙ্কটি সামগ্রিক বিবেচনায় বেশ বড়।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক: খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা (৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ)।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক: খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮ি১ কোটি টাকা (৩০ দশমিক ১১ শতাংশ)।
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক: খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ২৬২ কোটি টাকা (৪ দশমিক ৮২ শতাংশ)।
বিশেষায়িত ব্যাংক: খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা (৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ)।
ব্যাংকিং খাতের সার্বিক অবস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই তথ্য ও পরিসংখ্যান দেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত—উভয় খাতের ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের ৪০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ পার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিপত্র ও তথ্য বলছে, খেলাপি ঋণের এই ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার হার দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
