ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুইজন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালীগ্রাম ফ্লাইওভার এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই একটি ট্রাকের পেছনে একটি প্রাইভেটকার সজোরে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস, হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোরগামী একটি প্রাইভেটকারে করে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফিরছিলেন। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর মালয়েশিয়াপ্রবাসী আরিফুল ইসলাম দেশে ফেরেন। তাকে বরণ করে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় গিয়েছিলেন। তবে আনন্দঘন সেই প্রত্যাবর্তন মুহূর্তই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিণত হয় শোকাবহ ঘটনায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে প্রাইভেটকারটি মালীগ্রাম ফ্লাইওভার এলাকায় পৌঁছালে একই লেনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারবাহী একটি ট্রাকের পেছনে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানে। সংঘর্ষের তীব্রতায় গাড়িটির সামনের অংশ সম্পূর্ণভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনার শব্দে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়াদের উদ্ধার করেন।
ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মালয়েশিয়াপ্রবাসী আরিফুল ইসলাম, তার মা নুর জাহান, বোন আয়েশা বেগম এবং চালক জাহিদ শেখ। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরিফুলের ভাই রাকিবুল ইসলাম। ফলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচজনে। আহত দুইজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহতদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
| নাম | পরিচয় | স্থায়ী ঠিকানা |
|---|---|---|
| নুর জাহান | পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য | বালিয়াডাঙ্গি, ঝিকরগাছা, যশোর |
| আরিফুল ইসলাম | মালয়েশিয়াপ্রবাসী | বালিয়াডাঙ্গি, ঝিকরগাছা, যশোর |
| রাকিবুল ইসলাম | আরিফুলের ভাই | বালিয়াডাঙ্গি, ঝিকরগাছা, যশোর |
| আয়েশা বেগম | আরিফুলের বোন | বালিয়াডাঙ্গি, ঝিকরগাছা, যশোর |
| জাহিদ শেখ | প্রাইভেটকারচালক | গৌরিপুর, মনিরামপুর, যশোর |
পরিবারটির বাড়ি যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গি গ্রামে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একই পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যু এলাকায় গভীর শোকের আবহ সৃষ্টি করেছে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা এই দুর্ঘটনাকে পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ভাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত ও নিহতদের উদ্ধার করে। আহতদের প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাকিবুল ইসলামের মৃত্যু হয়।
শিবচর হাইওয়ে থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়েছে এবং ট্রাকটির অবস্থান, চালকের ভূমিকা ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভোরের কম আলো, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি অথবা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের যথাযথ সতর্ক সংকেতের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্সপ্রেসওয়ের মতো উচ্চগতির সড়কে কোনো যানবাহন একই লেনে দাঁড়িয়ে থাকলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রতিফলক চিহ্ন, সতর্কতামূলক আলো, নিরাপত্তা কোন এবং নির্ধারিত জরুরি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি চালকদেরও নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে গাড়ি চালানো এবং ভোর বা রাতের যাত্রায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও দেশের মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েতে নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যু শুধু তাদের স্বজনদের নয়, পুরো অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছাপ রেখে গেছে। দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
