টেস্ট ক্রিকেটে প্রাকৃতিক আলোর স্বল্পতার কারণে খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া এবং ওভার নষ্ট হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। এই জটিল সংকটের একটি স্থায়ী এবং বাস্তবমুখী সমাধান খোঁজার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) একটি ঐতিহাসিক নিয়মের অনুমোদন প্রদান করেছে। ভারতের আহমেদাবাদে আয়োজিত আইসিসির বোর্ড সভায় প্রধান নির্বাহীদের কমিটির (সিইসি) সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালার ভিত্তিতে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন অনুমোদিত নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন দিনের বেলাতেও যদি হঠাৎ আলোর স্বল্পতা বা প্রাকৃতিক আলোর অভাব দেখা দেয়, তবে খেলা বন্ধ রাখা হবে না। পরিবর্তে, প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের পারস্পরিক সম্মতি সাপেক্ষে লাল বলের বদলে গোলাপি বল ব্যবহার করে মাঠের খেলা চলমান রাখা যাবে। টেস্ট ক্রিকেটে আলোকস্বল্পতাজনিত কারণে যেন মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়, সেই লক্ষ্যে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি। এই প্রক্রিয়ায় ফ্লাডলাইট, আলো পরিমাপের উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা, সেন্সর এবং অন্যান্য আধুনিক আলোকসজ্জা প্রযুক্তির উন্নয়নে আইসিসি এবং মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) যৌথভাবে অর্থায়ন করবে।
কৌশলগত পরামর্শ প্রদানের নতুন নিয়ম ও সময়সীমা
আইসিসি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রচলিত নিয়মে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা ম্যাচ চলাকালীন দলগুলোর কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে একদিনের আন্তর্জাতিক (ওয়ানডে) এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নির্ধারিত ড্রিংকস বিরতি বা পানের বিরতির সময় সংশ্লিষ্ট দলের প্রধান কোচ কিংবা দলের মনোনীত স্টাফরা সরাসরি মাঠের ভেতর প্রবেশ করার অনুমতি পাবেন। মাঠে প্রবেশ করে তারা খেলোয়াড়দের সরাসরি কৌশলগত পরামর্শ, দিকনির্দেশনা ও নতুন পরিকল্পনা প্রদান করতে পারবেন।
এর আগের নিয়ম অনুসারে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কেবল দ্বাদশ ব্যক্তি বা অতিরিক্ত খেলোয়াড়রা পানি নিয়ে মাঠে যাওয়ার সময় চিরকুট কিংবা মৌখিক কোনো বার্তা বয়ে নিয়ে যেতে পারতেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগের ‘স্ট্র্যাটেজিক টাইম-আউট’-এর আদলেই এখন থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে এই নিয়মটি কার্যকর করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুই ইনিংসের মধ্যবর্তী বিরতির সময় সুনির্দিষ্টভাবে ১৫ মিনিট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এমসিসির নেওয়া সর্বশেষ সিদ্ধান্তসমূহ, যেমন—দিনের শেষ ওভারে কোনো ব্যাটার আউট হলে খেলা নিয়মরক্ষা রক্ষার্থে স্থগিত না করে ওই ওভারের বাকি অংশ সম্পন্ন করা এবং ‘বানি হপ ক্যাচ’ সংক্রান্ত নিয়মগুলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।
ওয়াইড বলের গাইড লাইন ও নারী ক্রিকেটের নতুন সূচি
ম্যাচ চলাকালীন ব্যাটাররা যখন ক্রিজে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেন বা শট খেলার উদ্দেশ্যে নড়াচড়া করেন, তখন আম্পায়ারদের পক্ষে নিখুঁত এবং নির্ভুলভাবে ওয়াইড বলের সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিলতা দূরীকরণে আম্পায়ারদের সুবিধার্থে বিশেষ ‘গাইড লাইন’-এর ব্যবহারকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি। বিশেষ করে লেগ সাইডে বোলারদের কিছুটা ছাড় দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সাল থেকে এই পরীক্ষামূলক ট্রায়াল বা পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যা এখন থেকে স্থায়ী ক্রিকেটীয় নিয়ম হিসেবে গণ্য হবে।
আইসিসির এই বোর্ড সভায় বৈশ্বিক নারী ক্রিকেট নিয়েও কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের নারী চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পূর্বনির্ধারিত জুন-জুলাই মাসের পরিবর্তে এগিয়ে এনে ওই একই বছরের ১৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
এছাড়া, ২০২৮ সালের নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বিদ্যমান ১০টি থেকে বৃদ্ধি করে ১২টি নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই মেগা টুর্নামেন্টে আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৮টি দল এবং আয়োজক বা স্বাগতিক দেশ সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। যদি স্বাগতিক দেশ পূর্বেই র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সরাসরি কোয়ালিফাই করে ফেলে, তবে র্যাঙ্কিংয়ের পরবর্তী শীর্ষ দলগুলো বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা পাবে। আর বাকি অবশিষ্ট দুটি দল মূল পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে ১০ দলের একটি আন্তর্জাতিক বাছাইপর্ব প্রতিযোগিতা খেলার মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং নির্বাচন ইস্যুতে বিশেষ প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে আইসিসি। এই আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হলেন ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকার ড. মোহাম্মদ মোসাজে এবং জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ডের তেবাঙ্গা মুকুলআনি।
এই প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে সরাসরি আলোচনা করবেন এবং সার্বিক অবস্থা মূল্যায়ন করবেন। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে আইসিসির পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীলঙ্কায় যাবেন আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা এবং দেবজিৎ সাইকিয়া।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ক্রমাগত বিস্তার, ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ওপর এর সামগ্রিক আধিপত্য নিয়ে আইসিসি বোর্ড সভায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক ক্রিকেট কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ সফরসূচির (এফটিপি) সাথে ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোকে কীভাবে আরও সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত উপায়ে পরিচালনা করা যায়, তা সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য আহমেদাবাদের সভায় একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, আগামী আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বৈশ্বিক বাছাইপর্বের সামগ্রিক রূপরেখাও এই সভায় চূড়ান্ত করা হয়।
