আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির তাজুরা নামক একটি আটক শিবির থেকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক অবশেষে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার পারস্পরিক সহযোগিতায় এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
Table of Contents
বিমানবন্দর আগমন ও অসুস্থ অভিবাসীদের বিবরণ
লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, আজ সোমবার সকালে বুরাক এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ বিমানে করে এই ১৭৪ জন বাংলাদেশি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করেন। দেশে ফেরত আসা এই দলটির মধ্যে ১৪ জন অভিবাসী শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে গতকাল রবিবার লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় এক বিবৃতির মাধ্যমে এই অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরার বিষয়টি দেশবাসীকে অবহিত করেছিল।
মানবপাচার ও আটক শিবিরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
লিবিয়া থেকে বিমান ছাড়ার পূর্বে সে দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আটক শিবিরে গিয়ে এই প্রত্যাবাসনকারী অভিবাসীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এ সময় ভুক্তভোগী বাংলাদেশিরা লিবিয়ায় এসে ভয়াবহ মানবপাচারের শিকার হওয়ার অত্যন্ত করুণ ও পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতার কথা রাষ্ট্রদূতের নিকট তুলে ধরেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রবাসীরা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক দালালচক্রের মিথ্যা প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী এবং দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্রের নিষ্ঠুর হাতের পুতুলে পরিণত হন এবং জিম্মি দশা বরণ করেন। অনেকেই তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে চালানো নৃশংস শারীরিক নির্যাতনের অবর্ণনীয় বর্ণনা দেন। এই মুক্তিপণের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে দেশের মাটিতে থাকা বহু পরিবারের জমি-জমা ও শেষ সম্বল বিক্রি করে সম্পূর্ণ সর্বস্বান্ত হতে হয়েছে।
এর বাইরেও তারা লিবিয়ার তাজুরা আটক শিবিরে দীর্ঘ মেয়াদের বন্দিজীবনে দৈনিক পর্যাপ্ত খাদ্য, পানের যোগ্য বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার তীব্র সীমাবদ্ধতার কারণে চরম মানবেতর জীবনযাপন করেছেন বলে উল্লেখ করেন। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তারা ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরনের অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ গমনে অগ্রসর না হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রদূতের দিকনির্দেশনা ও বৈধ অভিবাসনের গুরুত্ব
can-এর রাষ্ট্রদূত ভুক্তভোগীদের দুঃখ-কষ্টের কথা মনোযোগসহকারে শোনেন এবং তাদের গভীর সান্ত্বনা প্রদান করেন। তিনি দেশে ফিরে নতুন উদ্যমে সৎ উপায়ে জীবন শুরু করার জন্য প্রত্যাবাসনকারীদের বিশেষভাবে আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে লিবিয়ার এই চরম দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন, মানবপাচারের শিকার হওয়ার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এবং অনিয়মিত বা অবৈধ অভিবাসনের ভয়াবহ পরিণতির কথা সমাজের সকলের কাছে ব্যাপকভাবে তুলে ধরার অনুরোধ জানান, যেন গ্রামীণ সমাজের আর কোনো সাধারণ মানুষ এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বিদেশ গমনে প্ররোচিত না হয়।
রাষ্ট্রদূত আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন যে, অনিয়মিত এবং অবৈধ অভিবাসন কেবল একজন ব্যক্তি ও তার পরিবারের চরম আর্থিক ও সামাজিক অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে না, বরং এটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তিনি সকলকে সম্পূর্ণ বৈধ, আইনি ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বিদেশে যাওয়ার পূর্বে সরকারি অনুমোদিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা, সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই করা এবং অবৈধ দালালচক্রের কবল থেকে দূরে থাকার জন্য তিনি সকলকে পরামর্শ দেন।
লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মে মাসে আরও তিনটি বিশেষ বিমানের মাধ্যমে গানফুদা এবং তাজুরা নামক দুটি পৃথক আটক শিবির থেকে সর্বমোট ৫১৪ জন আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে প্রত্যাবাসন করার জন্য দূতাবাস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। মানবপাচারের শিকার হওয়া এসব ভাগ্যাহত অভিবাসীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিমানবন্দর চুক্তি এবং ওমরাহ ভিসার আড়ালে ইউরোপ যাত্রার এই অবৈধ প্রক্রিয়াটি যদি এখনই আইনগতভাবে কঠোর হস্তে বন্ধ করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও বহু সাধারণ মানুষ এভাবে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
লিবিয়া থেকে বাংলাদেশি অভিবাসী প্রত্যাবাসনের পরিসংখ্যান
চলতি মাসে লিবিয়ার বিভিন্ন আটক শিবির থেকে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার সামগ্রিক তথ্যাদি নিচে একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন খাত ও বিবরণ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| আজ সোমবার ফেরত আসা মোট সংখ্যা | ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক |
| আটক শিবিরের সুনির্দিষ্ট নাম | তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার, ত্রিপোলি, লিবিয়া |
| শারীরিকভাবে অসুস্থ অভিবাসীর সংখ্যা | ১৪ জন (বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন) |
| যাতায়াতকারী বিমান সংস্থার নাম | বুরাক এয়ারলাইন্স (বিশেষ ফ্লাইট) |
| আগমনকারী বিমানবন্দর | হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা |
| সহযোগিতাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা | আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা |
| চলতি মাসে মোট প্রত্যাবাসন লক্ষ্যমাত্রা | ৫১৪ জন (তিনটি পৃথক ফ্লাইটের মাধ্যমে) |
| অন্যান্য সক্রিয় আটক শিবিরের নাম | গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার, লিবিয়া |
| অবৈধ যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ও মাধ্যম | ওমরাহ ভিসা ও বিমানবন্দর চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ যাত্রা |
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিমানবন্দর সংলগ্ন প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে এই ফেরত আসা নাগরিকদের প্রাথমিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং তাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরিবারের নিকট হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
