খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুন ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মজীবনে দৃশ্যমাধ্যম ও ভিডিও চিত্রের শক্তিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রখ্যাত সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট যে, ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াকে একটি নাজুক উদীয়মান গণতন্ত্র থেকে কঠোর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর করার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও নাটকীয়ভাবে বদলে ফেলেছেন।
Table of Contents
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে বেড়ে ওঠা ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন মূলত টেলিভিশন যুগের সন্তান। সোভিয়েত আমলের জনপ্রিয় দূরদর্শন ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্রের দৃঢ়চেতা এবং স্বল্পভাষী গুপ্তচর নায়কেরা ছিলেন তাঁর আদর্শ। পুতিন নিজেই স্বীকার করেছেন যে, রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এসব চরিত্রই তাঁকে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’-তে কর্মজীবন গড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কেজিবির কর্মকর্তা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন প্রচারের আড়ালে ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের অধীনে এবং পরে মস্কোয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বোরিস ইয়েলৎসিনের প্রশাসনে একজন দক্ষ আমলা হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময়কার ছবিতে তাঁকে সব সময় মূল নেতৃত্বের পেছনে বা এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। সোভিয়েত নেতার প্রপৌত্রী নিনা ক্রুশ্চেভের মতে, তৎকালীন গোয়েন্দা মহলে পুতিনকে তাঁর আড়ালে থাকার দক্ষতার কারণে ‘মথ’ বা পতঙ্গ নামে ডাকা হতো।
১৯৯৯ সালে আকস্মিকভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০০০ সালে তিনি পূর্ণ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পুতিন এবং তাঁর জনসংযোগ পরামর্শকেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্ষমতা ধরে রাখতে দূরদর্শনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তিনি নিজেকে পূর্বসূরি বোরিস ইয়েলৎসিনের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর একজন যোগ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হন, যাঁর মদ্যপানের অভ্যাস জনসমক্ষে প্রায়ই রাষ্ট্রকে বিব্রত করত।
পুতিন নিজেকে মদ্যপানহীন, কর্মক্ষম এবং সুস্থ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের ভালো মানের আঙুরসরাস বা ওয়াইন পরিবেশন করা হলেও পুতিন সাধারণত মধু মেশানো এক কাপ চা পান করেই সন্তুষ্ট থাকতেন। তিনি নিজের শৌর্য ও কর্মক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধবিমান চালানো, জুডো খেলা এবং খালি গায়ে ঘোড়ায় চড়া, নদীতে মাছ ধরা বা সাঁতার কাটার মতো বহুবিধ প্রচারণামূলক চিত্রে অবতীর্ণ হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল তাঁর কর্তৃত্ববাদী প্রচারের এক আধুনিক রূপ।
২০১১ সালের দিকে পুতিনের রাজনৈতিক জীবন ও অবয়বে একটি বড় পরিবর্তন আসে। জনসমক্ষে তাঁর মুখাবয়ব আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুগম্ভীর ও অভিব্যক্তিহীন হয়ে ওঠে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানাবিধ কারিগরি ও চিকিৎসাগত জল্পনা শুরু হয়। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিজয়ী সমাবেশে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিছু বিশ্লেষক একে প্রকৃত আবেগ বললেও, অন্য অনেকে একে রাশিয়ার একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এরপর থেকে রাশিয়ায় ভিন্নমত প্রকাশকে আইনগতভাবে কঠোর হস্তে দমন করা শুরু হয়।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী এই রুশ প্রেসিডেন্টকে জনসমক্ষে আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের পর থেকে তিনি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সুরক্ষিত পরিবেশ ছাড়া ক্যামেরার সামনে আসেন না। বিশ্লেষকদের মতে, একসময়ের ক্রীড়াবিদ ও বীরোচিত ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা করা এই নেতা বর্তমানে নিজেরই তৈরি করা এক কঠোর দমন-পীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতির ফাঁদে আটকে গেছেন।
ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা ও ভাবমূর্তি পরিবর্তনের প্রধান সময়কাল নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সময়কাল বা বছর | রাজনৈতিক অবস্থান ও ভাবমূর্তির বৈশিষ্ট্য |
| ১৯৬০-১৯৭০ এর দশক | সোভিয়েত দূরদর্শনের গুপ্তচর চরিত্রগুলোর দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হওয়া। |
| ১৯৯০-এর দশক | কেজিবির দায়িত্ব শেষে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মস্কোর প্রশাসনে আড়ালে থাকা কর্মকর্তা। |
| ১৯৯৯-২০০০ বছর | রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়া। |
| ২০০৭ বছর | মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’-এর বর্ষসেরা ব্যক্তি হিসেবে স্বাতন্ত্র্যসূচক ক্ষমতাবান ছবির প্রকাশ। |
| ২০০৮-২০১২ বছর | প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালেও নেপথ্য চালিকাশক্তি হিসেবে সক্রিয় প্রচার বজায় রাখা। |
| ২০১১-২০১২ বছর | অবয়বের পরিবর্তন এবং অশ্রুসিক্ত চোখে পুনরায় দেশের সর্বোচ্চ পদে আরোহণ। |
| ২০২২-২০২৬ (বর্তমান) | ইউক্রেন যুদ্ধ কেন্দ্রিক কঠোর ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত দূরদর্শন উপস্থিতি। |
ভ্লাদিমির পুতিনের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তর প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং জনমানস নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রচারমাধ্যম কতটা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।
মন্তব্য