ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এক শ্বাসরুদ্ধকর চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালকে পেনাল্টি টাইব্রেকারে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ধরে রেখেছে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরের পুসকাস অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথে নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং পরবর্তী অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে সমতায় শেষ হয়। পরবর্তীতে পেনাল্টি ভাগ্যনির্ধারণী পর্বে আর্সেনালকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে ইউরোপসেরার মুকুট ধরে রাখে ফরাসি দলটি। এর মাধ্যমে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের পর ইতিহাসের দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের এক বিরল ও অনন্য কীর্তি স্থাপন করল প্যারিসের এই ক্লাবটি।
ম্যাচের শুরু ও প্রথমার্ধে আর্সেনালের আধিপত্য
খেলার শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে পিএসজিকে চাপে ফেলে দেয় লন্ডনের ক্লাব আর্সেনাল। ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে পিএসজির রক্ষণভাগের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় মারকিনিওসের একটি দুর্বল ক্লিয়ারেন্স আর্সেনালের লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের শরীরে লেগে দিক পরিবর্তন করে কাই হাভার্টজের উদ্দেশ্যে চলে আসে। প্রাপ্ত সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে এই জার্মান ফরোয়ার্ড অত্যন্ত জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে আর্সেনালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। পিএসজির গোলরক্ষক মাতবে সাপোনভের মাথার ওপর দিয়ে বলটি এত তীব্র গতিতে চলে যায় যে তা প্রতিহত করার কোনো সুযোগই তাঁর ছিল না।
গত বছরের চ্যাম্পিয়ন একাদশের ১০ জন খেলোয়াড়কে ধরে রেখেই এই ম্যাচে খেলতে নেমেছিল পিএসজি, যেখানে একমাত্র পরিবর্তন ছিলেন এই গোলরক্ষক সাপোনভ। পূর্বের শিরোপাজয়ের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে শুরুতে গোল হজম করেও পিএসজি মাঠের নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। অন্যদিকে আর্সেনাল গোল পাওয়ার পর কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়লে পিএসজির উসমান দেম্বেলে, ফ্যাবিয়ান রুইস এবং দিজিয়ের দুয়েরা ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকেন। প্রথমার্ধের বিরতির ঠিক আগে হাভার্টজ তাঁর ও দলের দ্বিতীয় গোলটি প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন, তবে মারকিনিওসের দৃঢ় রক্ষণাত্মক ভূমিকার কারণে সে যাত্রা বেঁচে যায় পিএসজি।
দ্বিতীয় আর্ধের নাটকীয়তা ও দেম্বেলের সমতাসূচক গোল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই পিএসজি গতি বাড়ানোর চেষ্টা করে। বিরতি কাটিয়ে আর্সেনালের খেলোয়াড়েরা পিএসজির চেয়ে প্রায় দুই মিনিট দেরিতে মাঠে প্রবেশ করেন। খেলা শুরু হওয়ার পর সময় নষ্ট করার অপরাধে রেফারি আর্সেনালের স্প্যানিশ রাইটব্যাক ক্রিস্টিয়ান মস্কেরাকে হলুদ কার্ড প্রদর্শন করেন। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে এই মস্কেরাই পিএসজিকে ম্যাচে ফেরার সুবর্ণ সুযোগ করে দেন। পিএসজির আক্রমণভাগের খেলোয়াড় খিচা কাভারাস্কেইয়া বল নিয়ে গতি সঙে আর্সেনালের পেনাল্টি বক্সে প্রবেশ করলে মস্কেরা তাঁকে ফাউল করে বসেন। রেফারি সাথে সাথেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান। এই পেনাল্টি থেকে উসমান দেম্বেলে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত শটে গোল করে পিএসজিকে ১-১ ব্যবধানে সমতায় ফেরান।
ম্যাচে সমতা আসার পর পিএসজির আক্রমণের ধার আরও বৃদ্ধি পায়। কাভারাস্কেইয়ার একটি দুর্দান্ত শট আর্সেনালের গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে এবং বারকোলা দুটি অত্যন্ত সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচটি অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলায় গড়ায়। এই সময়ে আর্সেনালের পক্ষে টিম্বার এবং গিওকেরেস গোল করার ভালো সম্ভাবনা তৈরি করলেও তা সফল করতে ব্যর্থ হন।
পেনাল্টি টাইব্রেকারের রোমাঞ্চকর ফলাফল
চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারণের জন্য দুই দলকে পেনাল্টি স্নায়ুপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। টাইব্রেকারের সেই উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলোর সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিচে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| পর্যায় বা শটের ক্রম | আর্সেনাল দলের পারফরম্যান্স | পিএসজি দলের পারফরম্যান্স | সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ম্যাচের ফলাফল |
| প্রাথমিক শটসমূহ | এবেরেচি এজের শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়। | নুনো মেন্দেসের নেওয়া শটটি আর্সেনাল গোলরক্ষক দাভিড রায়া চমৎকারভাবে ঠেকিয়ে দেন। | উভয় দলের ৪টি করে শট নেওয়ার পর টাইব্রেকারে ৩-৩ গোলে সমতা বিরাজ করছিল। |
| চূড়ান্ত পঞ্চম শট | ব্রাজিলিয়ান রক্ষণভাগের খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস বলটি বারের ওপর দিয়ে মেরে সুযোগ নষ্ট করেন। | লুকাস বেরালদো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করেন। | পিএসজি টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয়লাভ করে চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। |
টাইব্রেকারের চূড়ান্ত মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মাগালাইসের শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার পর পিএসজির লুকাস বেরালদো গোল করতেই পুসকাস অ্যারেনায় ফরাসি সমর্থকদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ২০২৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত ইউরোপের এই সর্বোচ্চ আসরে একটিও শিরোপা না থাকা পিএসজি, এবার টানা দুটি ট্রফি নিজেদের শোকেসে তুলে রিয়াল মাদ্রিদের পাশে এক মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাস তৈরি করল।
