রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তীব্র বাধার মুখে পড়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা। একপর্যায়ে হাসপাতালটির নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উপস্থিত সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি হামলার অভিযোগও উঠেছে। আজ শনিবার সন্ধ্যায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সবকটি প্রবেশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে হাসপাতালের $১$ নম্বর গেটের সামনে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দলবদ্ধভাবে অবস্থান নিতে দেখা যায়। গণমাধ্যমকর্মীরা পেশাগত কারণে হাসপাতালে প্রবেশ করে ভেতরের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে তাঁদের প্রথমে জোরপূর্বক বাধা দেওয়া হয়। এই বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
একপর্যায়ে সেখানে পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও মারমুখী হয়ে ওঠে। এ সময় খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা এসে উপস্থিত হন। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগ অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির মধ্যেই কিছু নিরাপত্তাকর্মী সাংবাদিকদের সঙ্গে চরম মারমুখী আচরণ করেন এবং তাঁদের সংবাদ সংগ্রহে লাগাতার বাধা প্রদান করেন।
Table of Contents
হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজারের ভূমিকা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তীতে আদ-দ্বীন হাসপাতালের একজন সিনিয়র ম্যানেজার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তবে হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহে বাধার সৃষ্টি এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে উপস্থিত সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেছেন।
এর আগে, আজ শনিবার বিকেলের দিকে আদ-দ্বীন হাসপাতালের প্রধান ভবনের ভেতরে একটি অননুমোদিত বেকারির সন্ধান পাওয়ার খবরে হাসপাতালটি পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। হাসপাতাল ভবনের ভেতরের বিভিন্ন স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এবং বলেন যে, হাসপাতালের ভেতরে পরিচালিত বেকারিটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছিল।
হাসপাতালের ভেতরে বেকারি পরিচালনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ
অননুমোদিত বেকারির সার্বিক চিত্র:
যান্ত্রিক অবকাঠামো: হাসপাতালের ভেতরে একটি বেকারি পাওয়া গেছে, যেখানে বড় দুটি ইলেকট্রিক ওভেনের সাহায্যে রুটি তৈরির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল।
কারিগরি তদারকি: এই বেকারি এবং ওভেন পরিচালনার ক্ষেত্রে কারিগরি তদারকির জন্য সেখানে কোনো পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী পাওয়া যায়নি, যা কোনোভাবেই হওয়া উচিত ছিল না।
পরিবেশগত অনিয়ম: বেকারি পরিচালনার ওই নির্দিষ্ট স্থানটিতে প্রচুর পরিমাণে ময়লা-আবর্জনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়া গেছে। বিষয়টি সামগ্রিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
বেকারির প্রভাব এবং সাম্প্রতিক শিশু মৃত্যুর তদন্ত
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হাসপাতালের ভেতরের এই কার্যক্রমের প্রভাব উল্লেখ করে আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ওই অননুমোদিত বেকারিতে নিয়মিত খাবার প্রস্তুত করা হতো। হাসপাতাল ভবনের অভ্যন্তরে এই ধরণের কার্যক্রম পরিচালনার ফলে সেখান থেকে কোনো ধরনের ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হয়েছিল কি না, সেটিও বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার সকালে মগবাজারের এই আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয়জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই দুঃখজনক ঘটনায় দেশের স্বাস্থ্য খাত এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত এই কমিটিকে আগামী $৩$ জুনের মধ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন ও এর প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা
আদ-দ্বীন হাসপাতালটি মূলত একটি অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়, যা ‘আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই দাতব্য ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সেখ মহিউদ্দিন।
প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক পরিচয় অনুযায়ী, তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপ ‘আকিজ গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সেখ আকিজ উদ্দিনের বড় ছেলে। একসঙ্গে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এবং পরবর্তীতে হাসপাতাল ভবনের ভেতরে অননুমোদিত বেকারি পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মূলত আজ এই সংবাদ সংগ্রহের পরিস্থিতি ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা-বাধার ঘটনাটি ঘটেছে।
