কালবৈশাখী ঝড়ে মেহেন্দীগঞ্জে লণ্ডভণ্ড শতাধিক ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়

বরিশাল জেলার মেঘনা নদী বেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ের তীব্র তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। এই ঝড়ের প্রভাবে উপজেলার শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ১০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক পূর্বমুহূর্তে আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মেঘনা পাড়ের এই দ্বীপ অঞ্চলের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগ এবং গভীর শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন।

ঝড়ের আঘাত ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

গত বুধবার, ২৭ মে সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে এই তীব্র ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ের প্রচণ্ড বাতাসে পৌরসভার চুনার গ্রামে হানিফ পোদ্দারের বসতঘরের ওপর একটি বিশাল আকৃতির চাম্বল গাছ উপড়ে পড়ে। এর ফলে ঘরটির বারান্দাসহ বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ঘটনার সময় ঘরে অবস্থান করা পরিবারের তিন সদস্য দ্রুত বাইরে বের হয়ে আসায় অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। হানিফ পোদ্দারের স্ত্রী জানান, তীব্র বাতাসের মধ্যে হঠাৎ ভাঙচুরের শব্দ পেয়ে তারা দ্রুত ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে যান এবং চোখের সামনে বিশাল গাছটি তাদের ঘরের ওপর পড়তে দেখেন।

অনুরূপভাবে পৌরসভার কালিকাপুর গ্রামের আদর্শ গ্রাম বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় শান্ত রাড়ির বসতঘরের ওপর একটি বড় নারিকেল গাছ ভেঙে পড়ে। গাছটি পড়ার ফলে তাদের সম্পূর্ণ ঘরটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পিতা-মাতা হারানো শান্ত ও তার বোন তাদের দাদীর সঙ্গে ওই ঘরেই বসবাস করতেন। সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতায় চলা এই অসহায় পরিবারের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল এই ঘরটি। ঝড়ে শেষ সম্বল হারিয়ে পরিবারটি এখন খোলা আকাশের নিচে থাকার আশঙ্কায় রয়েছে এবং তাদের বিকল্প কোনো আশ্রয় নেই। এছাড়া পৌরসভার বদরপুর গ্রামে নাদের আলী বেপারীর বাড়িতে অবস্থিত শাকিল নামের এক ব্যক্তির একটি মুরগির খামার ঝড়ে পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে, যার ফলে খামারি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম ও ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য

ঝড়ের পরপরই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর ভেঙে পড়া গাছপালা দ্রুত অপসারণের কাজে নেমে পড়েন মেহেন্দীগঞ্জ এলিট ফুটবল একাডেমির সদস্যরা। তারা সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক সচল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মেহেন্দীগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী মো. মামুন জানান, মেহেন্দীগঞ্জে অত্যন্ত শক্তিশালী ঝড় আঘাত হেনেছে। ঝড়ের তীব্রতায় তাদের নিজস্ব ফায়ার স্টেশনের একটি আমগাছ এবং একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে। তবে উপজেলার কোথাও প্রধান রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির প্রধান খাতগুলো নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

ক্ষতিগ্রস্ত খাত ও এলাকার বিবরণক্ষয়ক্ষতির ধরন ও প্রকৃত অবস্থাআক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিবরণ
চুনার গ্রাম, মেহেন্দীগঞ্জ পৌরসভাবসতঘরের ওপর বিশাল চাম্বল গাছ উপড়ে পড়েছেহানিফ পোদ্দারের বসতবাড়ি ও পরিবার
কালিকাপুর গ্রাম, পৌরসভা এলাকাঘরের ওপর বড় নারিকেল গাছ ভেঙে পড়েছেশান্ত রাড়ি, তার বোন ও দাদীর আশ্রয়স্থল
বদরপুর গ্রাম, পৌরসভা এলাকামুরগির খামার পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে গেছেখামারি শাকিলের বাণিজ্যিক খামার
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা ও ফায়ার স্টেশন১০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি, অসংখ্য গাছ ও তার ক্ষতিগ্রস্তবরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এবং ফায়ার স্টেশন
হিজলা ও মুলাদী উপজেলাঘরবাড়ি ও গাছপালার আংশিক ক্ষয়ক্ষতিপার্শ্ববর্তী দুই উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা

বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও ঈদুল আজহার দুর্ভোগ

ঝড়ের তাণ্ডবে পুরো মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা জুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক আসাদুল ইসলাম জানান, চারদিকে নদী বেষ্টিত এই দ্বীপ উপজেলাটি কোরবানির ঈদের আগের দিন বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ায় চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঝড়ে তাদের প্রধান সরবরাহ লাইনের অন্তত ১০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে এবং গাছ পড়ে তারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা সকাল থেকেই লাইন সংস্কারের কাজ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বুধবারের মধ্যে মূল বা মেইন লাইনটি মেরামত করা সম্ভব হলে হয়তো পরদিন বৃহস্পতিবার কিছু এলাকায় আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা যেতে পারে। তবে ভেঙে পড়া খুঁটিগুলো অপসারণ করতে বেশি সময় লাগার কারণে তিনি গ্রাহকদের ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

দুর্যোগের সার্বিক বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ জানতে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজুর রহমান এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই ফোন রিসিভ করেননি। উল্লেখ্য, এই ঝড়ের তীব্রতায় মেহেন্দীগঞ্জের পার্শ্ববর্তী হিজলা ও মুলাদী উপজেলাতেও বেশ কিছু ঘরবাড়ি ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।