দুর্বল তথ্য পরিকাঠামোর কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বীমা খাতে মুনাফা হ্রাসের ঝুঁকি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো যদি তাদের সেকেলে বা পুরোনো তথ্য ব্যবস্থার (Data Systems) ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) মোতায়েন করে, তবে তাদের মুনাফা ৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বীমা প্রযুক্তি সংস্থা ‘ইগলু’ (Igloo)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রৌনক মেহতা এই সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। তার মতে, দুর্বল পরিকাঠামো স্বয়ংক্রিয়করণের সুবিধাগুলোকে সীমিত করে দিচ্ছে, যার ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।

এআই বিনিয়োগ ও মুনাফার সম্ভাবনা

রৌনক মেহতার মতে, যদি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এআই খাতে সঠিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তবে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ৩০০ থেকে ৪০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সবার জন্য সমান নয়। যে সকল বীমা কোম্পানি তাদের তথ্য পরিকাঠামো বা সিস্টেম আপগ্রেড করতে ব্যর্থ হবে, তারা এ ধরনের সুফল থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

সাধারণ বীমা খাত বর্তমানে অত্যন্ত উচ্চ ‘কম্বাইন্ড রেশিও’ (Combined Ratio)-তে পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা বা আয়ের হার অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত নগণ্য থাকে। বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (BCG)-এর মার্চ মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ রাজস্বের ০.৬% থেকে বেড়ে ১.৯%-এ উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বর্তমানে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের প্রতিটি ধাপে এআই-এর ভূমিকা স্বীকার করে।

এআই ব্যবহারের ক্ষেত্র ও সুবিধাসমূহ

বীমা খাতে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। এর প্রধান সুবিধাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • দাবি নিষ্পত্তির খরচ কমানো: এআই প্রযুক্তি বীমা দাবির (Claims) প্রক্রিয়াকরণ দ্রুততর এবং সাশ্রয়ী করে তোলে।

  • প্রতারণা শনাক্তকরণ: এআই-এর মাধ্যমে জালিয়াতি বা জালিয়াতিপূর্ণ বীমা দাবিগুলো অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

  • অতিরিক্ত অর্থ প্রদান নিয়ন্ত্রণ: দাবি নিষ্পত্তির সময় ভুলবশত অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের হার হ্রাস পায়।

  • ঝুঁকি নির্বাচন: উন্নত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক ঝুঁকি নির্বাচন করা সম্ভব হয়, যা আল্টিমেট লস রেশিও (Loss Ratio) কমিয়ে আনে।

পরিসংখ্যান ও খাতের বর্তমান চিত্র

কেপিএমজি ইন্টারন্যাশনাল (KPMG International) এবং বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী বীমা খাতের এআই ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচের টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়বস্তুপরিসংখ্যান / তথ্যাদি
এআই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি (২০২৪ প্রত্যাশিত)রাজস্বের ০.৬% থেকে ১.৯%
কোম্পানির প্রবৃদ্ধিতে সিইওদের আস্থা৮২% (পূর্ববর্তী বছর ছিল ৭৪%)
বীমা খাতে আস্থাশীল সিইও৭৮%
শীর্ষ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে এআই-এর অবস্থান৭৩% সিইও-র কাছে অগ্রাধিকার
বাজেটের ১০-২০% বরাদ্দ (অ্যানালিটিক্স ও অটোমেশন)৬৭% সিইও-র পরিকল্পনা
সাইবার অপরাধকে বড় হুমকি মনে করেন৮৩% নির্বাহী

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সাইবার ঝুঁকি

রৌনক মেহতা মনে করেন, এআই নিয়ে বর্তমানে যে ব্যাপক প্রচার বা ‘হাইপ’ চলছে, তার চেয়ে মূল পরিকাঠামো বা অবকাঠামোর দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান এখনও কয়েক দশকের পুরোনো সিস্টেম ব্যবহার করছে। কার্যকরভাবে এআই প্রয়োগ করার জন্য এই সিস্টেমগুলোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন। ‘ইগলু’ বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৯ কোটি পলিসি প্রক্রিয়াকরণ করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে তাদের গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটিরও বেশি।

এদিকে, প্রায় ৮৩ শতাংশ বীমা খাতের নির্বাহী সাইবার অপরাধকে তাদের ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে মেহতা উল্লেখ করেন যে, দ্রুততর সিস্টেম বা প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ঝুঁকি বাড়ে না। অধিকাংশ সাইবার দুর্ঘটনা ঘটে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কারণে, সিস্টেমের গতির কারণে নয়। তাই কোম্পানিগুলোর উচিত ডেটা বা তথ্যের গুণমান এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া।

পরিশেষে, বীমা খাতের উন্নয়নে এআই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হলেও এর পূর্ণ সুফল পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী ও আধুনিক তথ্য পরিকাঠামো। শুধুমাত্র নিজস্ব বা প্রোপাইটারি ডেটা ব্যবহার করে এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড জ্ঞান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করাই এখন এই খাতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।