বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের দুর্গনগরীর পশ্চিমে বিষমর্দন এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ৫টি ভিন্ন বসতি যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ৬ সদস্যের একটি খনন দল ১২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কাজ শুরু করেছে এবং জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত খনন কার্যক্রম চলবে। বগুড়ার প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অনুমান করছেন, খননকালে প্রাপ্ত মন্দির অবকাঠামোগুলো প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ বছর পুরনো হতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মহাস্থানগড়ের দুর্গনগরীতে বিভিন্ন সময়ের খননে মৌর্যপূর্ব, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন এবং মুসলিম আমলের শত শত নিদর্শন পাওয়া গেছে। এই নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাপাঙ্কিত সোনার কয়েন, পোড়া মাটির নকশা করা ফলক, মূর্তি এবং ধাতু, মাটি ও পাথরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এখানে এমন একটি মাটির চুলও পাওয়া গেছে যা যীশুখৃষ্টের জন্মের বহু বছর আগে তৈরি।
খননের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্গনগরীর ভেতরের বসতি এবং এর চারপাশের সম্পর্ক খুঁজে বের করা, অর্থাৎ কি বসতিগুলো ক্রমাগত বা সমসায়িকভাবে গড়ে উঠেছিল। প্রাথমিক খননে দেখা গেছে, একটির পর একটি মন্দির দীর্ঘ সময় ধরে নির্মিত হয়েছে, এবং সবচেয়ে নিচের অবকাঠামো প্রাচীন কর্তোয়া নদীর প্লাবনভূমির ওপর স্থাপিত। প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো মৌর্য যুগের দুর্গনগড়ের প্রাচীরের সাথে তুলনা করা হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ, কে, এম. সাইফুল রহমান বলেন, “মন্দিরগুলো ৮০০-১০০০ বছর পূর্বে নির্মিত। এখানে পাল আমলে তৈরি ইট পুনঃব্যবহার করা হয়েছে। মন্দিরগুলো ৪র্থ থেকে ১২শ শতকের মধ্যে নির্মাণ করা হতে পারে।”
গবেষণার সহকারী এস. এম. হাসানাত বিন ইসলাম জানান, খননে পাওয়া ইট, মেঝের অংশ, বহু স্তরের নির্মাণ পদ্ধতি এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর পুনরায় ব্যবহার প্রমাণ করে মহাস্থান দুর্গনগরীতে বহু পর্যায়ে মন্দির নির্মাণ হয়েছে।
মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানা বলেন, “বিষমর্দনে খননে নকশাযুক্ত ইট, বিপুল সংখ্যক মৃৎপাত্রের ভাঙা অংশ, পোড়া মাটির ফলক, মূর্তির ভগ্নাংশ এবং জালের কাঠি পাওয়া গেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর পূর্বাংশে মাটির নিচে মৃৎপাত্রের অনেক টুকরো রয়েছে।”
খননের প্রাথমিক ফলাফল নিচের টেবিলে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| ক্র. নং | বসতি যুগ | প্রধান নিদর্শন | নির্মাণ পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| ১ | মৌর্যপূর্ব | মাটির ফলক, কয়েন | প্লাবনভূমিতে ইট ভিত্তিক নির্মাণ |
| ২ | পাল যুগ | ইটের প্রাচীর, মেঝে | পুনঃব্যবহৃত পাল ইট, বহু স্তরযুক্ত নির্মাণ |
| ৩ | সেন যুগ | ধাতব মূর্তি, পোড়া মাটি | মন্দির প্রাচীরের অবকাঠামো |
| ৪ | মুসলিম যুগ | পোড়া মাটির জাল কাঠি | পূর্ববর্তী মন্দিরের অংশ পুনঃব্যবহার |
| ৫ | গুপ্ত যুগ | সোনার কয়েন, ফলক | নকশাযুক্ত ইট ও মাটি, বিভিন্ন স্তরের ভিত্তি |
এই খনন কাজের মাধ্যমে মহাস্থানগড়ের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে নিচের স্তরে আরও বিস্তৃত খনন চালিয়ে নতুন নিদর্শন আবিষ্কার করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রাচীন সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের ধারা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
