ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) বিকেলে লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন সেতুবন্ধন রচিত হলো।
Table of Contents
আনুষ্ঠানিকতা ও মূল স্বাক্ষরকারী
লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম এবং গ্রেনাডার পক্ষে দেশটির হাইকমিশনার রাচের ক্রোনি এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। দুই দেশের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অভিন্ন চেতনা
কৌতূহলজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ ও গ্রেনাডা উভয় দেশই ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর একই দিনে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। গত পাঁচ দশক ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও, এত দিন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক কাঠামো ছিল না। এই চুক্তির মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ হলো।
বাংলাদেশ ও গ্রেনাডার মধ্যকার তুলনামূলক ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যসমূহ:
| বৈশিষ্ট্য | বাংলাদেশ | গ্রেনাডা |
| অবস্থান | দক্ষিণ এশিয়া | ক্যারিবীয় অঞ্চল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) |
| জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি | ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ | ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ |
| আন্তর্জাতিক জোট | কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ | কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, ওএএস (OAS) |
| প্রধান চ্যালেঞ্জ | জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা | জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি |
| অর্থনৈতিক শক্তি | ওষুধ শিল্প, তৈরি পোশাক ও জনশক্তি | পর্যটন, মসলা উৎপাদন (জায়ফল) ও পরিষেবা |
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার নতুন অধ্যায়
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম এই মাহেন্দ্রক্ষণকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বিশেষ অনুমোদনে এই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও ন্যায্য বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের বৈশ্বিক নেতৃত্ব এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে গ্রেনাডার প্রভাবশালী অবস্থান জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওষুধ এবং বস্ত্র শিল্পের বিশাল বাজার ক্যারিবীয় অঞ্চলে গ্রেনাডার মাধ্যমে বিস্তৃত হওয়ার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গ্রেনাডার দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অন্যদিকে, গ্রেনাডার হাইকমিশনার রাচের ক্রোনি বলেন, বাংলাদেশ ও গ্রেনাডা উভয়ই গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার অভিন্ন নীতিতে বিশ্বাসী। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতা অর্জনে দুই দেশ একই ধরণের সংকটের মোকাবিলা করছে। এই কূটনৈতিক সম্পর্কের ফলে শিক্ষা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও গ্রেনাডার এই নতুন কূটনৈতিক যাত্রা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসেবে দুই রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক যোগসূত্রকে আরও সুসংহত করবে। জাতিসংঘ ও কমনওয়েলথের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে দেশ দুটি এখন থেকে আরও জোরালোভাবে অভিন্ন দাবিগুলো তুলে ধরতে পারবে। ক্ষুদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ শক্তি যে বিশ্বমঞ্চে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, এই মৈত্রী তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
