১৯ দিনেই ট্রাইব্যুনালে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় আজ রবিবার (৭ জুন ২০২৬) ঘোষণা করা হবে। ঢাকার শিশু обеспечение বা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আজ এই বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করবেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি সুনির্দিষ্টভাবে ধার্য করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ রায় ঘোষণার এই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।

আদালত প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা

আদালতের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র থেকে জানা গেছে, আজ এই নৃশংস ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ঢাকার নিম্ন আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকাল থেকেই আদালত চত্বরে পুলিশের বিশেষ ফোর্স মোায়েন করা হবে। মামলার প্রধান আসামি মো. সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কঠোর পুলিশি পাহারায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হবে। সেখান থেকে নির্দিষ্ট সময়ে তাদের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারকের মুখোমুখি করা হবে।

নজিরবিহীন গতিতে বিচারিক কার্যক্রম সম্পধান

শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে মামলাটি রায়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল। মামলার নথিসূত্রে জানা যায়:

  • ২০ মে ২০২৬: গত ১৯ মে দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে (অর্থাৎ ২০ মে) পল্লবী থানায় ভুক্তভোগী শিশুর পিতা বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

  • ২৪ মে ২০২৬: মামলা দায়েরের মাত্র ৫ দিনের মাথায় তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (चार्जशीट) দাখিল করেন।

ওই একই দিনে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত বলে মত দিয়ে তা ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এরপর ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনও একই দিনে অভিযোগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হলেও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে সংশ্লিষ্ট বিচারকের ছুটি বাতিল করে বিশেষ ব্যবস্থায় শুনানির প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে ১ জুন আদালত দুই আসামির উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন (চার্জ ফ্রেম) করেন। একই সাথে পরের দিন মামলার বাদীসহ ১৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়। গত ২ জুন মামলার বাদী ও নিহতের পিতাসহ ১৬ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দি প্রদান করেন। আদালত মাত্র এক দিনেই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আসামিপক্ষের জেরা সম্পন্ন করার ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেন।

আত্মপক্ষ समर्थन ও আইনি যুক্তিতর্ক

সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়ার পর বিচারক ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন। ৩ জুন অনুষ্ঠিত আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে মামলার প্রধান আসামি মো. সোহেল রানা নিজের অপরাধের দায় স্বীকার করে আদালতের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে তার স্ত্রী এবং মামলার দ্বিতীয় আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। শুনানি শেষে বিচারক ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন নির্ধারণ করেন।

৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুল রহমান দুলু এবং রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ আদালতে নিজ নিজ পক্ষে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আদালতে জোরালো যুক্তি প্রদর্শন করেন। শুনানিকালে তিনি আসামি সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগসমূহ পড়ে শোনান এবং মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার মূল অভিযোগসহ উপস্থিত সকল সাক্ষীদের জবানবন্দি আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন। পিপি আদালতে উল্লেখ করেন যে, মামলার প্রত্যেকটি সাক্ষী শিশু রামিসার গলাকাটা বীভৎস মরদেহ সশরীরে দেখেছেন বলে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়েছে।

শুনানিতে মাদক সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী স্পষ্ট করেন যে, ঘটনার সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা নেশাগ্রস্ত ছিলেন এমন কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, পল্লবীর ওই নির্দিষ্ট এলাকাটি পর্যাপ্ত উন্নত না হওয়ায় ঘটনার সময়কার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে মামলার দ্বিতীয় আসামি স্বপ্নার সম্পৃক্ততা নিয়ে পিপি বলেন, স্বপ্না যদি নিরপরাধ হতেন তবে তিনি ঘটনাটি দেখে বাইরে এসে চিৎকার করে লোকজনকে জানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে প্রধান আসামি সোহেলকে জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছেন এবং পুরো অপরাধের সময় সেখানে অবস্থান করে সহযোগিতা জুগিয়েছেন।

বেলা দেড়টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের পিপি আজিজুল রহমান দুলু একটানা শুনানি করার পর দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ তার যুক্তিতর্ক শুরু করেন। তিনি প্রথমে দাবি করেছিলেন যে, শুধু জবানবন্দির আলোকে আসামিকে শাস্তি দেওয়া যায় না এবং একজন নেশাগ্রস্ত মানুষের জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সোহেলের নেশাগ্রস্ত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত নয় বলে যুক্তি খণ্ডন করা হলে আসামিপক্ষের আইনজীবী তা মেনে নেন। পরিশেষে আসামি সোহেল নিজের দোষ স্বীকার করায় তার পক্ষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় লাশ গুম বা অপরাধে সহায়তার দায়ে ৭ বছরের কারাদণ্ডের আর্জি জানান আসামিপক্ষের এই আইনজীবী।

রায়ের কার্যকারিতা নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য

রায় ঘোষণার পর তা কার্যকর হতে কতদিন সময় লাগতে পারে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, এটি সম্পূর্ণ উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি আইনগত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে জানান যে, বিচারিক আদালতে রায় ঘোষণার পর একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জন্য উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপে আপিল করার সুযোগ থাকে এবং সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণবিজ্ঞান বা প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারও থাকে। তবে দেশের প্রধান বিচারপতি চাইলে এই বিশেষ মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার স্বার্থে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে পারেন, যা একান্তই তার নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত পটভূমি

মামলার অভিযোগ ও বিবরণী থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে ২০২৬ সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজের ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতরে ডেকে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার পরিবার তাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করে। একপর্যায়ে তারা আসামির বন্ধ ঘরের সামনে রামিসার জুতা জোড়া দেখতে পান।

অনেক ডাকাডাকির পরও ঘর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং ঘরের ভেতরে থাকা একটি বড় বালতির মধ্যে তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি দেখতে পান। ঘটনার সময় আসামি স্বপ্না আক্তার ঘরের ভেতরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।

উপস্থিত লোকজন তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি স্বীকার করেন যে, তার স্বামী মো. সোহেল রানা নিজের হীন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে জোরपूर्वक ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে গলা কেটে হত্যা করে। এই নৃশংস ঘটনার পর নিহত শিশুর পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে দুইজনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।