খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৪ পিএম

ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন প্রতিভার আবির্ভাব নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বৈভব সূর্যবংশীর উত্থানের গতি এবং অল্প বয়সেই তাঁর চারপাশে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের জার্সি পরার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে নজরকাড়া পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। মাঠের সাফল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁর জনপ্রিয়তা, আর সেই জনপ্রিয়তার প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও।
রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে আইপিএলে ব্যাট হাতে দারুণ কিছু ইনিংস খেলার পর থেকেই বৈভবকে ঘিরে আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে। বয়সের তুলনায় তাঁর ব্যাটিংয়ের পরিণত ভাব, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং বড় মঞ্চে আত্মবিশ্বাস তাঁকে ক্রিকেটপ্রেমীদের নজরে এনে দেয়। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপন ও পণ্য প্রচারণার জন্যও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনি আকর্ষণীয় মুখ হয়ে ওঠেন।
বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, বৈভব ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত হয়েছেন। একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির জন্য তিনি বর্তমানে এক কোটি রুপির বেশি পারিশ্রমিক দাবি করছেন বলেও কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব চুক্তির প্রকৃত আর্থিক মূল্য সব ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে না আসায় নির্দিষ্ট অঙ্ক নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
প্রকাশিত বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বৈভব সূর্যবংশীর আনুমানিক মোট সম্পদের পরিমাণ ৭ থেকে ১০ কোটি রুপির মধ্যে হতে পারে। তাঁর সম্ভাব্য আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে আইপিএলের পারিশ্রমিক, ম্যাচ ফি, ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে পাওয়া অর্থ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তি। তবে এই সম্পদের হিসাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না দেখে বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা আনুমানিক হিসাব হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
বৈভবের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে ক্রিকেট সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসএস। সারিন স্পোর্টসের এই ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁর বছরে প্রায় ৫০ লাখ রুপির সরঞ্জাম চুক্তির কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শুধু ক্রিকেট সরঞ্জাম সরবরাহের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি; বৈভবকে ঘিরে বিশেষ সংস্করণের ব্যাট বাজারে আনার কথাও জানা গেছে। এত অল্প বয়সী একজন ক্রিকেটারের নামে পণ্য বাজারজাত করার উদ্যোগ তাঁর বাণিজ্যিক গ্রহণযোগ্যতার একটি দৃষ্টান্ত।
পুষ্টি পানীয় ব্র্যান্ড কমপ্ল্যানও বৈভবকে তাদের প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিশোর বয়সী ক্রীড়াবিদদের পুষ্টি, নিয়মিত অনুশীলন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বার্তা পৌঁছে দিতে তাঁর পরিচিতি ব্যবহার করা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৈভবের জনপ্রিয়তা এই ধরনের প্রচারণার ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে।
প্রযুক্তি খাতেও তাঁর উপস্থিতি দেখা গেছে। গুগলের অর্থ লেনদেনসেবা গুগল পের একটি প্রচারণায় বৈভবকে যুক্ত করা হয়েছে। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা, নিরাপদ লেনদেন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে তাঁর পরিচিতিকে কাজে লাগানো হয়েছে।
শক্তিবর্ধক পানীয় ব্র্যান্ড রেড বুলের সঙ্গেও বৈভবের সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। আইপিএলের সময় রাজস্থান রয়্যালসের সতীর্থ ধ্রুব জুরেলের সঙ্গে একটি প্রচারণামূলক চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেই আয়োজনে ৩০ বলে ৬০ রানের ইনিংস খেলে বৈভব শুধু নিজের ব্যাটিং দক্ষতাই দেখাননি, প্রচারণাটিকেও বাড়তি আলোচনায় নিয়ে আসেন।
তাঁর বাণিজ্যিক পরিচিতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। তরুণদের স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের প্রতি উৎসাহিত করার উদ্যোগে ঝাড়খণ্ডের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মে মাসে বৈভবকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করার ঘোষণা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন কিশোর ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তাকে জনসচেতনতামূলক কাজে ব্যবহার করার দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে অল্প বয়সে খ্যাতি, অর্থ এবং প্রচারের আলো—সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যেমন সুযোগ, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও। বৈভবের পরিবার এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক বলে জানা গেছে। অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, প্রচারমূলক কার্যক্রম কিংবা বাণিজ্যিক ব্যস্ততা যেন তাঁর নিয়মিত অনুশীলন, ক্রিকেটীয় উন্নতি এবং স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে বাধা না সৃষ্টি করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বৈভবের সামনে তাই শুধু ক্রিকেটীয় প্রতিভা প্রমাণের প্রশ্ন নয়; প্রত্যাশা ও খ্যাতির চাপ সামলে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক থাকার পরীক্ষাও রয়েছে। ১৫ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করা নিঃসন্দেহে বিরল অর্জন। কিন্তু এই শুরুটিকে দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারে পরিণত করতে হলে তাঁকে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা এবং মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে হবে।
ক্রিকেটে তাঁর ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে, তার চূড়ান্ত উত্তর অবশ্য সময়ই দেবে। তবে এত অল্প বয়সেই যে জনপ্রিয়তা, প্রত্যাশা এবং বাণিজ্যিক মূল্য তৈরি হয়েছে, তাতে বৈভব সূর্যবংশী ইতোমধ্যেই ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত কিশোর প্রতিভাদের একজন হয়ে উঠেছেন।
মন্তব্য