আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার দায়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিএনপি। বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫৯ জন নেতাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা তৃণমূল রাজনীতিতে এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কঠোর অবস্থানের নেপথ্যে দলীয় শৃঙ্খলা
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রতীক বরাদ্দের পর দেখা গেছে, অনেক আসনেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে দলীয় পদধারী নেতারা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলের হাইকমান্ড থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও তা অমান্য করায় এই গণ-বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দলের আদর্শ ও ঐক্য বজায় রাখার স্বার্থে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য ছিল। এর ফলে বহিষ্কৃত নেতারা এখন থেকে আর বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন না।
বিভাগওয়ারী বহিষ্কৃত কয়েকজন শীর্ষ নেতার তালিকা:
| বিভাগ | নেতার নাম ও পদবি | নির্বাচনি আসন |
| ঢাকা | লুৎফর রহমান খান আজাদ (চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা) | টাঙ্গাইল-৩ |
| রাজশাহী | তাইফুল ইসলাম টিপু (সহ-দপ্তর সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি) | নাটোর-১ |
| চট্টগ্রাম | প্রকৌশলী ফজলুল আজীম (সাবেক সংসদ সদস্য) | নোয়াখালী-৬ |
| ময়মনসিংহ | এবি সিদ্দিকুর রহমান (যুগ্ম আহ্বায়ক, দক্ষিণ জেলা বিএনপি) | ময়মনসিংহ-১০ |
| সিলেট | শেখ সুজাত মিয়া (সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটি) | হবিগঞ্জ-১ |
| রংপুর | এ জেড এম রেজওয়ানুল হক (সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটি) | দিনাজপুর-৫ |
| বরিশাল | আব্দুস সোবহান (সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটি) | বরিশাল-১ |
বিদ্রোহ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি
বহিষ্কৃত ৫৯ জনের তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতা রয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে টাঙ্গাইল ও মুন্সিগঞ্জের প্রভাবশালী নেতারা এই কোপে পড়েছেন। অন্যদিকে, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তিদের বহিষ্কার নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনে দলের একক আধিপত্য বজায় রাখতে এবং ভোট বিভাজন রোধ করতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
নির্বাচনের মাঠে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনী প্রচারণার ঠিক আগে এমন গণ-বহিষ্কারের ফলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বহিষ্কৃত অনেক নেতাই দাবি করেছেন যে, স্থানীয় জনমতের চাপে তাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধ্য হয়েছেন। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করার অর্থ হলো দলের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করা। এই বহিষ্কারাদেশের ফলে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি দূর হয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ সুগম হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
উপসংহার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘর গোছানো এবং অন্তর্কোন্দল মেটাতে বিএনপির এই ‘শুদ্ধি অভিযান’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৫৯ জন নেতার এই বড় তালিকা প্রমাণ করে যে, বিএনপি তার সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। এই পদক্ষেপের ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের জয়লাভের পথ কতটা নিষ্কণ্টক হয়, তা এখন দেখার বিষয়।









