ঢাকার সাভারে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার পাঁচ এজাহারভুক্ত আসামিসহ মোট ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সাভার মডেল থানা পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ধৃত অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, চুরি, হত্যাচেষ্টা মামলা এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এই ২৪ জনকে গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। বুধবার দুপুর থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত সাভারের বেদে পাড়া ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় এই চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ও পুলিশের ওপর হামলা
পুলিশ ও স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ জুন সন্ধ্যায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলামকে (২৮) গ্রেফতার করতে সাভার মডেল থানা পুলিশের একটি দল অভিযানে নামে। রফিকুল ইসলাম সাভার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বক্তারপুর পোড়াবাড়ি এলাকার মো. আব্দুর রহিমের ছেলে।
সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে বক্তারপুর বালুর মাঠ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশ সদস্যরা রফিকুল ইসলামকে শনাক্ত করেন এবং তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালান। এ সময় রফিকুল ইসলাম গ্রেফতার এড়াতে তার সহযোগীদের চিৎকার করে ডাকাডাকি শুরু করেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে অর্ধশতাধিক স্থানীয় লোক জড়ো হয়। একপর্যায়ে রফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা পুলিশের আইনি অভিযানে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে এবং ওই এলাকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা নিজেদের সরকারি পরিচয় প্রদান করেন এবং জড়ো হওয়া জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা চালান। তবে পুলিশের অনুরোধ উপেক্ষা করে রফিকুল ইসলাম ও তার অনুসারীরা সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এসএম শামীম এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মশিউর রহমানের ওপর চড়াও হয়। তারা পুলিশ সদস্যদের লাঠি, লোহার রডসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করতে শুরু করে।
হামলার একপর্যায়ে দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারীরা তাদের ওপর আবারও নৃশংসভাবে আক্রমণ চালায়। একই সাথে তারা হুমকি দেয় যে, ভবিষ্যতে ওই এলাকায় কোনো আসামি গ্রেফতারের চেষ্টা করা হলে পুলিশকে দেখে নেওয়া হবে। পরবর্তীতে সাভার মডেল থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হামলাকারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ সদস্যরা রক্তাক্ত অবস্থায় আহত এসআই এসএম শামীম ও এএসআই মশিউর রহমানকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
পুলিশি অভিযান ও গ্রেফতারের বিবরণ
সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর এই ঘটনার পরপরই ঢাকা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় সাভার মডেল থানা পুলিশ গভীর গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত সাভার বেদে পাড়াসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে পুলিশের ওপর হামলা মামলার মূল এজাহারভুক্ত ৫ জন আসামিকে সরাসরি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
গ্রেফতারকৃত ৫ এজাহারভুক্ত আসামির পরিচয় নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | গ্রেফতারকৃত আসামির নাম | বয়স | পিতার নাম | স্থায়ী বাসস্থান ও এলাকা |
| ১. | আরিফুল ইসলাম | ২০ বছর | মো. রতন | কাঞ্চনপুর এলাকা, ১ নম্বর ওয়ার্ড, সাভার পৌরসভা |
| ২. | সাগর মিয়া | ২৩ বছর | মো. মহির উদ্দিন | কাঞ্চনপুর এলাকা, ১ নম্বর ওয়ার্ড, সাভার পৌরসভা |
| ৩. | মো. মারুফ | ২০ বছর | গোলাম হোসেন | বক্তারপুর তিন রাস্তার মোড় এলাকা, সাভার |
| ৪. | মো. হুমায়ুন | ১৯ বছর | মো. হাসান | পোড়াবাড়ি এলাকা, সাভার |
| ৫. | মো. রাকেশ মাল | ৩০ বছর | বাবুল | বক্তারপুর এলাকা, সাভার |
পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ জানিয়েছেন, পুলিশের ওপর হামলার মামলায় এজাহারভুক্ত এই ৫ জন ছাড়াও একই অভিযানে সাভারের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ১৯ জনের বিরুদ্ধে সাভার থানাসহ বিভিন্ন থানায় হত্যা, মাদক ব্যবসা, চুরি, হত্যাচেষ্টা এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল। গ্রেফতারকৃত সব আসামিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করার প্রস্তুতি চলছে এবং ঘটনার মূল হোতা রফিকুল ইসলামসহ বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
