খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ১:২ পিএম

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় এক সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছেন নুর মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং আজকের পত্রিকা–এর কলাপাড়া প্রতিনিধি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৪০)। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কলাপাড়া পৌর শহরের মাছ বাজারসংলগ্ন সদর রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা মোয়াজ্জেম হোসেনকে উদ্ধার করে প্রথমে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে একই রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আহত সাংবাদিকের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ওরফে ফাহিম এবং সরকারি মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বেল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জন নেতা-কর্মী জড়িত ছিলেন।
মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ঘটনার সময় তিনি সদর রোডের একটি মোবাইল ফোনের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় কয়েকজন এসে তাঁকে দোকান থেকে বাইরে ডেকে নেন। বাইরে বের হওয়ার পর তাঁকে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি দৌড়ে আবার দোকানের ভেতরে আশ্রয় নিলে হামলাকারীরা সেখান থেকেও তাঁকে টেনে বের করে দ্বিতীয় দফায় মারধর করে। এতে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
আহত সাংবাদিকের দাবি, এই হামলার পেছনে আগের একটি ঘটনার বিরোধ কাজ করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুন কলাপাড়া শহরের বাদুরতলী এলাকায় তাঁর ভগ্নিপতি আনিসুর রহমানের দোকান ও বসতবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। সেই সময়ও সরকারি মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ওই ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবার তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বেল্লাল হোসেন অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি বরিশালে এলএলবি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন এবং পরে বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধে আগেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এ হামলার সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানান।
অন্যদিকে, উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ওরফে ফাহিম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘটনার পর জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব জাকারিয়া আহমেদ বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। সংগঠনের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে হামলার খবর পেয়ে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন শিকদার হাসপাতালে গিয়ে আহত সাংবাদিকের খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলার মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে আনার সময় মোয়াজ্জেম হোসেন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আবদুল মালেক জানান, মারধরের কারণে তাঁর মাথায় আঘাত লেগেছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যদিও মাথায় কোনো কাটা ক্ষত পাওয়া যায়নি, তবু সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে পাঠানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহল।
মন্তব্য