কর ফাঁকির একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি বন্ধ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছর থেকে আয়কর রিটার্নে উত্তরাধিকারসূত্রে বা উপহার হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদের আর্থিক মূল্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘মূল্য অজানা’ দেখিয়ে সম্পদের প্রকৃত মূল্য গোপন রাখার সুযোগ সীমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বহু করদাতা আয়কর রিটার্নে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণালঙ্কার বা অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে ‘মূল্য অজানা’ উল্লেখ করে আসছেন। ফলে বাস্তবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেও এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য কর নথিতে প্রতিফলিত হয়নি। এর কারণে সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর বা সারচার্জের আওতা নিরূপণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় করদাতাদের উত্তরাধিকারসূত্রে বা উপহার হিসেবে পাওয়া সব ধরনের সম্পদের অর্থমূল্য নির্ধারণ করে আয়কর রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রিটার্ন দাখিলের সময় এসব সম্পদের মূল্য কর ফাইলে সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে পৃথক কোনো সম্পদ কর কার্যকর নেই। তবে নির্ধারিত সীমার বেশি সম্পদের মালিকদের বার্ষিক আয়ের ওপর সারচার্জ পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, চার কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদের মালিক করদাতারা সারচার্জের আওতায় পড়েন। ফলে সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক হলে নতুন করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক করদাতা সারচার্জের আওতায় আসতে পারেন।
এনবিআর জানিয়েছে, সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ সহজ করতে দেশের ভূমি অফিসগুলো থেকে বিভিন্ন এলাকার গত প্রায় ৪০ বছরের মৌজা মূল্যের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য অনলাইন আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে জমি, ফ্ল্যাট বা অন্যান্য স্থাবর সম্পদের মূল্য নির্ধারণে একটি মানসম্মত ভিত্তি তৈরি হবে এবং ‘মূল্য অজানা’ দেখানোর সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে।
এছাড়া স্বর্ণালঙ্কারসহ অন্যান্য সম্পদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা ও ব্যাখ্যা আগামী আয়কর পরিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সম্ভাব্য প্রভাবের সারসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নতুন বিধান | উত্তরাধিকারসূত্রে ও উপহার পাওয়া সম্পদের মূল্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক |
| বর্তমান সমস্যা | বহু করদাতা সম্পদের মূল্য ‘অজানা’ হিসেবে উল্লেখ করেন |
| সারচার্জ সীমা | চার কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য |
| সম্ভাব্য নতুন সারচার্জদাতা | প্রায় ২ হাজার ব্যক্তি |
| সারচার্জের আওতায় আসতে পারে | মোট প্রায় ৪ হাজার নতুন করদাতা |
| মূল্যায়নের ভিত্তি | গত প্রায় ৪০ বছরের মৌজা মূল্য তথ্য |
| তথ্যের উৎস | ভূমি অফিসসমূহ |
| বাস্তবায়ন সহায়তা | অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন সিস্টেমে তথ্য সংযোজন |
| প্রত্যাশিত অতিরিক্ত রাজস্ব | ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা |
| নির্দেশিকা প্রকাশ | জুলাইয়ের মধ্যে আয়কর পরিপত্রে |
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং করদাতাদের প্রকৃত সম্পদচিত্র আয়কর নথিতে প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তি বা পরিবার দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের মূল্য প্রকাশ না করে এসেছেন, তাদের সম্পদের প্রকৃত পরিমাণও কর প্রশাসনের নথিতে অন্তর্ভুক্ত হবে।
জুলাই মাসের মধ্যে প্রকাশিতব্য আয়কর পরিপত্রে সম্পদের মূল্যায়ন পদ্ধতি, গ্রহণযোগ্য মূল্য নির্ধারণের সূত্র এবং অনলাইন রিটার্নে তথ্য সংযোজনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে এনবিআর জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ কার্যকর হলে কর প্রশাসনের তথ্যভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হবে এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।